রবীন্দ্র জীবনে মৃত্যু : পর্ব ২ (সারদা দেবী)

রবীন্দ্রনাথের মা সারাদাদেবী ছিলেন যশোর জেলার দক্ষিণডিহির মানুষ। আনুমানিক ছ’বছর বয়সে তাঁর বিবাহ হয় দেবেন্দ্রনাথের সঙ্গে । তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ ভাবেই অন্তঃপুরবাসিনী স্বামীঅন্তপ্রাণ বধূ । রবীন্দ্রনাথ তাঁদের চতুর্দশ সন্তান। তাঁদের প্রথম সন্তান জন্মগ্রহণ করেন ১৮৩৮ সালে – তখন সারাদাদেবীর বয়স আনুমানিক ১৫ বছর মাত্র ( প্রভাত মুখোপাধ্যায়ের লেখা অনুযায়ী যদি তাঁর জন্মসাল আনুমানিক ১৮২৩ ধরা হয় )। প্রথম সেই সন্তান ( কন্যা ) কিন্তু খুবই স্বল্পায়ু ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের জন্ম ১৮৬১, কিন্তু তারও পরে ১৮৬৩ সালে দেবেন্দ্রনাথ আর সারদা দেবীর আরও এক পুত্র জন্মগ্রহণ করেন – বুধেন্দ্রনাথ, যদিও তাঁর আয়ুও ছিল মাত্রই এক বছর। ছোটবেলায় মায়ের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের যোগাযোগ কিন্তু কিছুটা ক্ষীণই ছিল। রবীন্দ্রনাথের যখন একেবারে কিশোর বয়স, তখন সারদা দেবী হাতে কোন ভাবে আঘাত পান। সেই আঘাতই ক্রমে ক্রমে প্রাণঘাতী এক অসুস্থতায় পরিণীত হয়, আর তারই শেষ পরিণতি হিসেবে এক বছর রোগের সঙ্গে যুদ্ধ করে তাঁর জীবনাবসান হয় ১৮৭৫ সালের ১০ই মার্চ। তখন তাঁর বয়স আনুমানিক ৫২, স্বামী দেবেন্দ্রনাথ ৫৮, আর পুত্র রবীন্দ্রনাথ ১৩ বছর ১০ মাস।রবীন্দ্রনাথের জীবনে সম্ভবত এই প্রথম কোন মৃত্যুকে এত কাছ থেকে দেখা। অনেক পরে জীবন স্মৃতিতে মায়ের এই মৃত্যু সম্পর্কে তিনি লিখেছেন – “ইতিপূর্বে মৃত্যুকে আমি কোনোদিন প্রত্যক্ষ করি নাই। মা’ র যখন মৃত্যু হয় আমার তখন বয়স অম্ভ্রপ। অনেকদিন হইতে তিনি রোগে ভুগিতেছিলেন, কখন যে তাঁহার জীবনসংকট উপস্থিত হইয়াছিল তাহা জানিতেও পাই নাই। এতদিন পর্যন্ত যে-ঘরে আমরা শুইতাম সেই ঘরেই স্বতন্ত্র শয্যায় মা শুইতেন। কিন্তু তাঁহার রোগের সময় একবার কিছুদিন তাঁহাকে বোটে করিয়া গঙ্গায় বেড়াইতে লইয়া যাওয়া হয়– তাহার পরে বাড়িতে ফিরিয়া তিনি অন্তঃপুরের তেতালার ঘরে থাকিতেন। যে-রাত্রিতে তাঁহার মৃত্যু হয় আমরা তখন ঘুমাইতেছিলাম, তখন কত রাত্রি জানি না, একজন পুরাতন দাসী আমাদের ঘরে ছুটিয়া আসিয়া চীৎকার করিয়া কাঁদিয়া উঠিল, “ওরে তোদের কী সর্বনাশ হল রে।” তখনই বউঠাকুরানী তাড়াতাড়ি তাহাকে ভর্ৎসনা করিয়া ঘর হইতে টানিয়া বাহির করিয়া লইয়া গেলেন– পাছে গভীর রাত্রে আচমকা আমাদের মনে গুরুতর আঘাত লাগে এই আশঙ্কা তাঁহার ছিল। স্তিমিত প্রদীপে, অস্পষ্ট আলোকে ক্ষণকালের জন্য জাগিয়া উঠিয়া হঠাৎ বুকটা দমিয়া গেল কিন্তু কী হইয়াছে ভালো করিয়া বুঝিতেই পারিলাম না। প্রভাতে উঠিয়া যখন মা’র মৃত্যুসংবাদ শুনিলাম তখনো সে-কথাটার অর্থ সম্পূর্ণ গ্রহণ করিতে পারিলাম না। বাহিরের বারান্দায় আসিয়া দেখিলাম তাঁহার সুসজ্জিত দেহ প্রাঙ্গণে খাটের উপরে শয়ান। কিন্তু মৃত্যু যে ভয়ংকর সে- দেহে তাহার কোনো প্রমাণ ছিল না– সেদিন প্রভাতের আলোকে মৃত্যুর যে-রূপ দেখিলাম তাহা সুখসুপ্তির মতোই প্রশান্ত ও মনোহর। জীবন হইতে জীবনান্তের বিচ্ছেদ স্পষ্ট করিয়া চোখে পড়িল না। কেবল যখন তাঁহার দেহ বহন করিয়া বাড়ির সদর দরজার বাহিরে লইয়া গেল এবং আমরা তাঁহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ শ্মশানে চলিলাম তখনই শোকের সমস্ত ঝড় যেন এক-দমকায় আসিয়া মনের ভিতরটাতে এই একটা হাহাকার তুলিয়া দিল যে, এই বাড়ির এই দরজা দিয়া মা আর একদিনও তাঁহার নিজের এই চিরজীবনের ঘরকন্যার মধ্যে আপনার আসনটিতে আসিয়া বসিবেন না। বেলা হইল, শশ্মান হইতে ফিরিয়া আসিলাম; গলির মোড়ে আসিয়া তেতালায় পিতার ঘরের দিকে চাহিয়া দেখিলাম– তিনি তখনো তাঁহার ঘরের সম্মুখের বারান্দায় স্তব্ধ হইয়া উপাসনায় বসিয়া আছেন।“

জননী সারদা দেবীর মৃত্যুদিনের একটি স্পষ্ট ছবি এই রচনা থেকে পাওয়া যায় । কিন্তু সাধারণ ভাবে রবীন্দ্রনাথের রচনায় মায়ের উল্লেখ কম। অনেক পরে প্রায় ষাট বছর বয়েসে লেখা একটি কবিতা আমরা পাই , যেখানে সম্ভবত তাঁর মায়ের স্মৃতি আবছা ভাবে ধরা পড়েছে –

“ মাকে আমার পড়ে না মনে।
শুধু কখন খেলতে গিয়ে
হঠাৎ অকারণে
একটা কী সুর গুনগুনিয়ে
কানে আমার বাজে,
মায়ের কথা মিলায় যেন
আমার খেলার মাঝে।
মা বুঝি গান গাইত, আমার
দোলনা ঠেলে ঠেলে;
মা গিয়েছে, যেতে যেতে
গানটি গেছে ফেলে।
মাকে আমার পড়ে না মনে।
শুধু যখন আশ্বিনেতে
ভোরে শিউলিবনে
শিশির-ভেজা হাওয়া বেয়ে
ফুলের গন্ধ আসে,
তখন কেন মায়ের কথা
আমার মনে ভাসে?
কবে বুঝি আনত মা সেই
ফুলের সাজি বয়ে,
পুজোর গন্ধ আসে যে তাই
মায়ের গন্ধ হয়ে।
মাকে আমার পড়ে না মনে।
শুধু যখন বসি গিয়ে
শোবার ঘরের কোণে;
জানলা থেকে তাকাই দূরে
নীল আকাশের দিকে
মনে হয়, মা আমার পানে
চাইছে অনিমিখে।
কোলের ‘পরে ধরে কবে
দেখত আমায় চেয়ে,
সেই চাউনি রেখে গেছে
সারা আকাশ ছেয়ে।”

সুএ: নেট থেকে

কবির নাম জানা নেই তাই দেয়া গেল না

https://www.facebook.com/groups/rntfc/