বেলাঅবেলা (গল্প) : মাহবুবুল আলম (পর্ব-১)

ঘরের বারান্দায় বসে নিমগ্ন হয়ে নানা কথা ভাবছিলেন কাশেম সাহেব। হঠাৎ তার মন ছুটে যায় দুরন্ত শৈশব ও কৈশোরের সেই মধুময় দিনে। মাঠের পাটক্ষেত ও বিভিন্ন ফসলীক্ষেত মাড়িয়ে আবুল কাশেম সাহেব এখন একটা রঙিন ঘুড়ি নিয়ে দৌড়াচ্ছে। তার পিছু পিছু দৌড়াছে আরো কিছু ছেলেপুলে। এই ঢিল ছুড়ছেন কারো বরই গাছে, নয়তো চড়ে বসেছেন কারো আম না হয় পেয়ারা গাছে।
লেখাপড়া, শেষ করেন পাশের গ্রামের স্কুলেই। মেট্টিকুলেশন পাশ করার পরই চাকুরী। নিন্মমান কারনীক থেকে উচ্চমান সহকারী, শেষ-মেষ পেনশনের বছর পাঁচেক আগে পারসেজকর্মকর্তা হিসেবে পদোন্নতি। তারপর অবসর। বেশ কিছুদিন থেকেই কাশেম সাহেবের মান বড়ই চঞ্চল ও বিক্ষিপ্ত। নিজের শেষ জীবনের চিন্তার পাশাপাশি মরণচিন্তা তাকে পেয়ে বসেছে। তার মনের কেন এমন হাল, আসুন আমরা জেনে নেই আবুল কাশেম সাহেবের জবানীতেই-
বয়স যত বাড়ছে মেজাজটা তার বড় বেশি খিটখিটে হয়ে যাচ্ছে। তার মানে আমার স্ত্রী তৈয়বার। এই কিছুদিন আগে মাত্র ছেলে-মেয়ে মিলে আমাদের বিয়ে বার্ষিকীর চারদশক পালন করলো। আমরা বিশেষ করে আমি নিজে শুধু সাক্ষীগোপালের মতো জো-হুকুম বলে সব কিছুই মানিয়ে নিয়েছি। আর ছেলে মেয়েরা যা যা করতে বলেছে তা একটা প্রশিক্ষিত ময়না ও বানরের মতো অনুসরণ করে গেছি।
এই যেমন-ময়না আল্লা ক বা দেখা মুক্তির মরা পাঞ্জাবীর মরা-এর মতো। অথবা স্কুলের ফিজিক্যাল টিচারের কমান্ডের মতো বায়ে-ঘুর, ডাইনে-ঘুর, বাম-ডান, বাম-ডান বামডান বাম এর মতো। এছাড়া যে আমার কোনো উপায় নেই। এখন তাদের কথা মতো না চললে ব্যাকডেটেড অমুক তমুক কত যে খিস্তিখেউর শুনতে হয়, সে কষ্টের কথা বলার মতো আমার যে কেউ সমব্যাথী নেই। না বউ, না ছেলে-মেয়ে। এ জন্যে তৈয়বার একটা সুক্ষ্ম চাল আছে। আর সে চালটা হলো অগোচরে সে ছেলে-মেয়ে-বউ-ঝিদের কাছে আমার সম্মন্ধে বিরূপ মন্তব্য করে করে সবার মধ্যে একটা ভয় ও নেতিবাচক ধারণার সৃষ্টি করে রেখেছে।
একদিন চায়ের কথা বলতে রান্নাঘরে উঁকি দিতেই শুনি তৈয়বা আমার বিরুদ্ধে বিভিন্ন কথা বলে ছোট বউয়ের কান পাকাচ্ছে। কি কথা বলা হচ্ছে শুনার জন্য কান খাড়া করতেই শুনি-
তোমরাতো জাননা বউ মা, এই লোকটা এই জীবনে আমায় কত জ্বালিয়েছে। জা’য়েদের কান কথায় বিশ্বাস করে আমাকে অযথা গালমন্দ করেছে। যা রোজগার করেছে তার সিংহভাগই দিয়ে দিয়েছে মা-বাবা-ভাই-বোনদের জন্য। এ ব্যাপারে কোন কথা তুললেই আমাকে দিয়েছে না না অপবাদ, আমি নাকি চাইনা সে তার পরিবারের জন্য খরচপাতি করুক। এ নিয়ে কত যে ঝগড়া-ঝাটি মনমালিন্য তা বলে শেষ করা যাবে না। এই হলো আমার কপাল। এই বুড়ো বয়সেও যে একটু শান্তিতে থাকবো তারও জো নেই। এটা সেটা নিয়ে একটা না সমস্যার সৃষ্টি করবে।
কান আরো একটু লম্বা করতেই শুনি ছোট বউ বলছে-
কই মা, বাবাকে দেখেতো কিছুতেই এমন মনে হয়না। সহজ সরল মানুষ, কারো সাতেপাঁচে নেই। তাছাড়া বাবার পেনশনের সব টাকাতো ছেলে-মেয়েদের হাতেই তুলে দিল। শুনলাম, আপনার নামেও নাকি এক লাখ টাকা এফডিআর করে দিয়েছে। আর নাতি-নাতনী ও ছেলেদের বউদের জন্যও তো সাধ্য মতো সব কিছুই করেন…।
মলি কথা শেষ করার আগেই তৈয়বা ছোঁ মেরে কথা কেড়ে নিয়ে বলে-
এই দেখ, একেবারে মিথ্যে কথা। ভন্ডামী। আমার নামে পঞ্চাশ হাজার টাকার এফডিআর করে সবাইকে বলে বেড়ায় এক লাখ।
তা হলে মা আমার শুনতে কোন ভুল হয়েছে। স্যরি।
না থাক স্যরি বলতে হবে না। তুমি যা শুনেছ তাই বলেছো এতে স্যরি বলার কি আছে।
কড়াইয়ে খুন্তি দিয়ে মাছ উল্টাতে উল্টাতে আবার বলে-
আরে আমি জীবনে যা কষ্ট করেছি এর তুলনায়তো এ টাকা পানিভাতও না। আমি যদি ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া করিয়ে মানুষ না করতাম, তা হলে তার ভাইদের ছেলেদের মতো সব মূর্খ থেকে যেত। সেতো মাসে মাসে বেতনের কিছু টাকা আমার হাতে গুজে দিয়ে মনে করেছে তার কর্তব্য পালন শেষ। আর আমি সারা জীবন ঝি-গিরি করে করে সংসারটা যে এ পর্যন্ত টেনে আনলাম, তার কি কোনো মূল্য নেই।
না মা, মূল্য থাকবে না কেন? অবশ্যই আছে। আপনি কষ্ট না করলেতো সংসারের এতটুকু হতো না।…চলমান

সুএ: নেট থেকে

https://www.facebook.com/groups/bengalicultureandlifestyle/

Leave a Reply