রবীন্দ্র জীবনে মৃত্যু : পর্ব ১০ (মৃণালিনী দেবী) (১৯০২)

১৯০২। রবীন্দ্রনাথের বয়স ৪১। এতদিন বেশ অনেক কাছের মানুষের মৃত্যু তিনি দেখেছেন, কষ্ট পেয়েছেন, কষ্ট সয়েছেন। কাদম্বরী দেবীর চলে যাওয়া তাঁর সমস্ত চেতনাকে নাড়িয়ে দিয়ে গেছে। কিন্তু আক্ষরিক অর্থে মৃত্যু এতদিন তাঁর আশেপাশেই ঘোরাফেরা করেছে, তবু সরাসরি তাঁর নিজের সংসারের মধ্যে প্রবেশ করেনি। এইবার এই ১৯০২এ মৃত্যু সেই আঘাত হানল – সরাসরি তাঁর নিজের সংসারেই ।

১৮৮৩ সালে, রবীন্দ্রনাথ যখন ২২, তখন তার চাইতে প্রায় তের বছরের ছোট একটি মেয়ে ঠাকুরবাড়িতে প্রবেশ করল, তাঁর হাত ধরে, তাঁরই বালিকা বধু হয়ে। পৈত্রিক নাম ভবতারিণী, কিন্তু জোড়াসাঁকোয় এসে, তিনি হয়ে উঠলেন মৃণালিনী । আর সেই হয়ে ওঠা তো শুধু নামের বহিরঙ্গেই নয়, শিক্ষায়, ব্যবহারে, আচারে আচরণে । তাই প্রথম দিকে যে ছোট্ট মেয়েটি হয়ত বেশী কথাই বলতেন না কথায় খুব বেশ যশুরে টান থাকার জন্যে, তিনি গেলেন লরেটোয় পড়তে, শিক্ষা নিলেন ইংরিজি আর সংস্কৃত ভাষা অধ্যয়নে, পিয়ানো চর্চায় । সেই সঙ্গে চলল বাইরের কিছু কাজও – যেমন ঘরোয়া নাটকে অভিনয় করা, রবীন্দ্রনাথের নির্দেশে সংস্কৃত রামায়ণ অনুবাদ করা, সেই সঙ্গে মহাভারত, মনুসংহিতা আর উপনিষদেরও কিছু শ্লোক অনুবাদ করে রাখা, বাংলাদেশের নানা রকমের রূপকথা সংগ্রহ করা – ইত্যাদি। অবনীন্দ্রনাথ যে লিখেছিলেন – ক্ষীরের পুতুল, সেই গল্পটি মৃণালিনী দেবীর কাছ থেকেই পাওয়া, মৃণালিনী যেমন করে বলেছিলেন – তেমন করেই লিখেছিলেন অবন ঠাকুর।

কিন্তু এগুলিতো সব শিক্ষা আর বিদ্যাচর্চার দিক। তাঁর কল্যাণী রূপ তো ধরা আছে বিশ্বখ্যাত স্বামীর সঙ্গে তাঁর জীবন চর্চায় । রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে যখনই থেকেছেন শিলাইদহে বা শান্তিনিকেতনে, চারপাশের সবাইকে, সব কর্মচারীকে আপন করে নিয়েছেন। ভাল রান্না করতে পারতেন – রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে মিলে নানা রকম খাবার তৈরির পরীক্ষা চালাতেন। মিষ্টি বানাতেন ভাল, তাঁর হাতের মিষ্টি আর অন্য রান্নার ভক্ত ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশও । ঘরোয়া নানা কাজের সঙ্গে সঙ্গে আবার অন্যদিকে শুশ্রূষা করেছেন অসুস্থ ভাসুরপুত্র বলেন্দ্রনাথ আর নীতীন্দ্রনাথকে – চোখের জলে বিদায়ও দিয়েছেন তাঁদের । আবার যখন শান্তিনিকেতনে এসে থেকেছেন – তখন সেই আশ্রমের গড়ে ওঠার সময়ে নিজের সর্ব শক্তি দিয়ে স্বামীর পাশে থেকেছেন, নিজের ভালবাসা দিয়ে, পরিশ্রম দিয়ে, এমনকি সমস্ত গয়না দিয়েও সেই আশ্রমকে গড়ে তুলেছেন। তাই একদিকে যেমন হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখায় পাই – “ আশ্রমের কার্যে কবির সহধর্মিণী সহকর্মিণী হইয়াছিলেন। বিদ্যালয়ের নিয়মানুসারে ছাত্রগণের করণীয় সকল বিষয়ের তত্ত্বাবধান তিনি অবশ্য কর্তব্য মনে করিতেন। পাছে বালকগণের কষ্ট হয়, এই ভাবিয়াই তিনি তাহাদের খাওয়ার ও জলখাবারের ভার নিজের হাতেই লইয়াছিলেন ও দেখিয়াশুনিয়া খাওয়াইতেন। এই অপত্য নির্বিশেষ স্নেহ তাঁহাকে বালকগণের মাতৃস্থানীয়া করিয়া রাখিয়াছিল “, তেমনি অন্যদিকে প্রমথ নাথ বিশী লিখেছেন – “ শান্তিনিকেতন স্থাপনে তিনি যেমন সর্বতোভাবে নিজের সাহচর্য, শক্তি, এমনকি অনটনের দিনে অলঙ্কারগুলি পর্যন্ত দিয়া সহায়তা করিয়াছিলেন, সংসারে তাহা একান্ত বিরল “ । শান্তিনিকেতন গঠনে মৃণালিনী দেবীর এই ভূমিকা আরও পরিষ্কার রথীন্দ্রনাথের লেখায় – “ “ তিনি সব অসুবিধা হাসিমুখে মেনে নিয়ে ইস্কুলের কাজে বাবাকে প্রফুল্লচিত্তে সহযোগিতা করতে লাগলেন । তার জন্য তাঁকে কম ত্যাগ স্বীকার করতে হয়নি। যখনই বিশেষ প্রয়োজন হয়েছে, নিজের অলঙ্কার একে একে বিক্রি করে বাবাকে টাকা দিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত হাতে কয়েকগাছা চুড়ি আর গলার একটি চেন ছাড়া তাঁর কোন গয়না অবশিষ্ট ছিল না। মা পেয়েছিলেন প্রচুর, বিবাহের যৌতুক ছাড়াও শাশুড়ির পুরনো আমলের ভারী গয়না ছিল অনেক। শান্তিনিকেতনের বিদ্যালয়ের খরচ যোগাতে সব অন্তর্ধান হল। বাবার নিজের যা কিছু মুল্যবান সম্পদ ছিল তা আগেই তিনি বেচে দিয়েছিলেন ।“

এগুলি একটু বিস্তারিত ভাবে বলছি এই জন্যে যে, যে শান্তিনিকেতন আজ আমাদের সবার পরিচিত, আমাদের সবার যাওয়ার আর ভাল লাগার জায়গা, তাঁর গোড়ার দিকে রবীন্দ্রনাথ আর মৃণালিনীর যে কতখানি যৌথ কষ্টস্বীকার ছিল – তা হয়ত অনেকেরই অজানা। মৃণালিনী যেভাবে সুখে দুঃখে তাঁর বিশ্বখ্যাত স্বামীর পাশে এসে দাঁড়াতে চেয়েছিলেন – তার শেষ নিদর্শন ছিল এই শান্তিনিকেতন পর্ব । কারণ হয়ত বা কঠোর পরিশ্রমের জন্যেই আশ্রম বিদ্যালয় স্থাপনের কয়েক মাসের মধ্যেই তাঁর শরীর পড়ল ভেঙ্গে, ১৯০২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তাঁকে কলকাতায় আনা হল চিকিৎসার জন্য। সেই চিকিৎসার সঙ্গে সঙ্গে চলতে লাগলো রবীন্দ্রনাথের নিজের হাতের সেবা, নিজের হাতে সারাক্ষণ পাখার বাতাস করে যেতেন অসুস্থ স্ত্রীকে । হেমলতা দেবী লিখেছেন – “ মৃত্যুশয্যায় কবি নিজের হাতে তাঁর যে শুশ্রূষা করেছিলেন, তার ছাপটি মুদ্রিত হয়ে রয়েছে পরিবারের সকলের মনে। প্রায় দু মাস তিনি শয্যাশায়ী ছিলেন, ভাড়া করা নার্সদের হাতে পত্নীর শুশ্রূষা ভার কবি একদিনের জন্যও দেন নাই। “ তবু সব চিকিৎসা, সব সেবার বাঁধন কাটিয়ে মৃণালিনী চলে গেলেন অমৃতলোকে – ১৯০২ সালের ২৩শে নভেম্বর, বাংলা ১৩০৯ সালের ৭ই অগ্রহায়ণ – মাত্র ঊনত্রিশ বছর বয়সে। রথীন্দ্রনাথের লেখায় – “ মৃত্যুর আগের দিন বাবা আমাকে মায়ের ঘরে নিয়ে গিয়ে শয্যাপার্শ্বে তাঁর কাছে বসতে বললেন। তখন তাঁর বাকরোধ হয়েছে। আমাকে দেখে চোখ দিয়ে কেবল নীরবে অশ্রুধারা বইতে লাগল। মায়ের সঙ্গে সেই আমার শেষ দেখা। আমাদের ভাইবোনদের সকলকে সে রাত্রে বাবা পুরনো বাড়ীর তেতলায় শুতে পাঠিয়ে দিলেন। একটি অনির্দিষ্ট আশঙ্কার মধ্যে আমাদের সারারাত জেগে কাটলো। ভোরবেলায় অন্ধকার থাকতে বারান্দায় গিয়ে লাল বাড়ীর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলুম। সমস্ত বাড়ীটা অন্ধকারে ঢাকা, নিস্তব্ধ নিঝুম, কোন সাড়া শব্দ নেই সেখানে। আমরা তখনই বুঝতে পারলুম আমাদের মা আর নেই, তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। “

চলে গেলেন মৃণালিনী । মৃত্যু আঘাত হানল রবীন্দ্রনাথের একেবারে নিজের ঘরে। থেমে গেল তাঁর সেই প্রিয় মিষ্টি সম্বোধনের পত্রধারা – “ ভাই ছুটি “। চিরদিনের ছুটিতে চলে গেছেন স্ত্রী, স্থিতধী স্বামী কয়েকদিন পরেই এক চিঠিতে লিখলেন – “ ঈশ্বর আমাকে যে শোক দিয়েছেন, তাহা যদি নিরর্থক হয়, তবে এমন বিড়ম্বনা আর কি হইতে পারে। ইহা আমি মাথা নীচু করিয়া গ্রহণ করিলাম । যিনি আপন জীবনের দ্বারা আমাকে নিয়ত সহায়বান করিয়া রাখিয়াছিলেন, তিনি মৃত্যুর দ্বারাও আমার জীবনের অবশিষ্ট কালকে সার্থক করিবেন। তাঁহার কল্যানস্মৃতি আমার সমস্ত কল্যাণ কর্মে নিত্য সহায় হইয়া আমাকে বলদান করিবে ।“ ফিরে গেলেন শান্তিনিকেতনে, লিখতে শুরু করলেন একের পর এক কবিতা । এই সময়ের সাতাশটি কবিতা নিয়ে প্রকাশ পেল “ স্মরণ “। উৎসর্গ পত্রে আর কিছু লেখা নেই – শুধু সেই অমোঘ তারিখ – ৭ই অগ্রহায়ণ, ১৩০৯। শোকের সংযত প্রকাশ। আবার কয়েকদিন পরেই মাঘোৎসব – লেখা হল প্রায় বারোটি গান । তার মধ্যেই পাওয়া গেল – স্বপন যদি ভাঙ্গিলে রজনী প্রভাতে, মনমোহন গহন যামিনী শেষে, আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, দুঃখরাতে হে নাথ কে ডাকিলে, শুন্যহাতে ফিরি হে নাথ, নিবিড় ঘন আঁধারে জ্বলিছে ধ্রুবতারা, আমারে কর জীবন দান, গভীর রজনী নামিল হৃদয়ে – এইসব গানগুলিকেও ।

উৎসব আর উপাসনার পথ বেয়ে শোক হয়ে উঠল প্রার্থনা, হৃদয়ে গভীর রজনী নামলেও সেই পূর্ণতার পায়ে মনের স্থান খুজে পেতে চাওয়া।

আজিকে তুমি ঘুমাও, আমি জাগিয়া রব দুয়ারে–
রাখিব জ্বালি আলো।
তুমি তো ভালো বেসেছ, আজি একাকী শুধু আমারে
বাসিতে হবে ভালো।
আমার লাগি তোমারে আর হবে না কভু সাজিতে,
তোমার লাগি আমি
এখন হতে হৃদয়খানি সাজায়ে ফুলরাজিতে
রাখিব দিনযামী।
তোমার বাহু কত-না দিন শ্রান্তি-দুখ ভুলিয়া
গিয়েছে সেবা করি,
আজিকে তারে সকল তার কর্ম হতে তুলিয়া
রাখিব শিরে ধরি।
এবার তুমি তোমার পূজা সাঙ্গ করি চলিলে
সঁপিয়া মনপ্রাণ,
এখন হতে আমার পূজা লহো গো আঁখিসলিলে–
আমার স্তবগান।

( স্মরণ গ্রন্থের ২৬ সংখ্যক কবিতা, রচনা – ২৩শে পৌষ, ১৩০৯ )

সুএ: নেট থেকে

কবির নাম জানা নেই তাই দেয়া গেল না

https://www.facebook.com/groups/rntfc/

Leave a Reply