রবীন্দ্র জীবনে মৃত্যু : পর্ব ১১ (রেণুকা / রাণী) (১৯০৩)

মৃণালিনী দেবীর বিদায়ের পরেও মৃত্যু-দেবতার ক্ষুধা মিটল না। তিনি চাইলেন আরো আহুতি ।আর সে আহুতি দিতে হবে আবার সেই রবীন্দ্রনাথকেই – তাঁরই নিজ হাতে। আর বেশীদিন অপেক্ষাও সইবে না সেই নির্মম দেবতার – তাই এক আঘাতের রেশ কাটতে না কাটতেই নতুন করে মরণান্তিক আঘাতের জন্য প্রস্তুত হতে হল কবিকে।

মেজ মেয়ে রেণুকা, ডাক নাম রাণী – জন্মেছিল ১৮৯১র ২৩শে জানুয়ারী। ছোট থেকেই একটু যেন স্বতন্ত্র। জেদী, বই পড়তে ভালবাসে, কিন্তু অন্যদিকে সাজগোজ, খাওয়াদাওয়া সম্পর্কে আবার উদাসীন। এত বড়, এত বিখ্যাত বাড়ীর মেয়েদের চালচলনের সঙ্গে যেন তার বেশী মিল ছিল না, তার মধ্যে কোথাও যেন একটা ক্ষ্যাপা হাওয়ার পাগলামি ছিল। সাংসারিক অনেক রীতিনীতির যেন একটু ঊর্ধে ছিল সে। মৃণালিনী মাঝে মাঝে একটু বিরক্ত হয়ে বলতেন – যে, এমন সৃষ্টিছাড়া মেয়ে তিনি কখনও দেখেন নি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ হয়ত বুঝতেন তাঁর এই মেয়েকে, আর সেই মেয়েরও আশ্রয় ছিল তার পিতাই। কিন্তু এই পিতাই তার বিবাহ দিয়েছিলেন মাত্র সাড়ে দশ বছর বয়সেই, ১৯০১ সালে, বড় কন্যা মাধুরীলতার বিবাহের এক মাস পরেই। যে রবীন্দ্রনাথ অনেক সময়েই আমাদের চিন্তাভাবনাকে অগ্রসর করে দিয়ে গেছেন, সেই তিনিই কেন এত কম বয়সে মেয়ের বিবাহ দিয়েছিলেন তা হয়ত এত দিন পরে ঠিক করে বলা যাবে না। তবে মেয়ের বিয়ে ঠিক করে এসে তিনি স্ত্রীকে বলেছিলেন “ রাণীর বিয়ে ঠিক করে এলুম, ছেলেটিকে আমার বড় ভাল লেগেছে ছোট বৌ, যেমন সুন্দর দেখতে, তেমনি মিষ্টি অমায়িক স্বভাব। রাণীটা যা জেদী মেয়ে, ওর বর একটু ভালমানুষ না হলে চলবে কেন ? “ রাণী খুব খুশী হল না, কিন্তু বিয়ের পরই বর বাইরে চলে যাবে পড়তে, সে থাকতে পারবে তার বাবার কাছেই – এই ভেবেই যেন নিশ্চিন্ত হলেন। এখানেও হয়ত ভাগ্যদেবতার খেলা – কারণ কিছুদিন পর তার মা বিদায় নেবেন – শেষ দিন গুলো সে মায়ের কাছছাড়া হবে না। আবার তারও কিছুদিন পর যখন তার নিজেরই ডাক পড়বে, তখন সে নিজেও বিদায় নিতে পারবে তার বাবার হাত ধরেই।

মৃণালিনী দেবী চলে গেলেন ১৯০২এর নভেম্বরে। তার কিছুদিন পরেই কন্যা রাণীর অসুস্থতা ধরা পড়ল – সেই কালান্তক ব্যাধি – যক্ষ্মা । স্ত্রীর মৃত্যুর আঘাত সামলে নেওয়ার আগেই কবিকে আবার ব্যস্ত হয়ে পড়তে হল। তাকে নিয়ে ছুটলেন হাজারীবাগ – হাওয়া বদলের জন্য, যদি স্বাস্থ্যের কিছু উন্নতি হয়। কিন্তু হল না – তাই যেতে হল আরো অনেক দূরে, হিমালয়ের কোলে – আলমোড়ায়। সে সময় আলমোড়া ছিল অত্যন্ত দুর্গম – কষ্টকর সেই যাত্রা । তবু মেয়ের যদি উপকার হয়, সেই ভেবে সব কষ্ট অগ্রাহ্য করে তিনি গেলেন সেখানে। কিন্তু না, কোন উন্নতি নেই। ফেরার সময় – কুলি ভাড়া করে খাট সুদ্ধ মেয়েকে নামিয়ে আনতে হল কাঠগোদাম – পাহাড়ি পথে প্রায় ত্রিশ মাইল পথ। মুমূর্ষু মেয়ের পাশে পাশে সেই দীর্ঘ দুর্গম পথ রবীন্দ্রনাথ হেঁটে নামলেন । পথিমধ্যে আরো অনেক দুর্ভোগ সামলে তাঁরা যখন জোড়াসাঁকোয় ফিরলেন – তখন রেণুকার অবস্থা আরও খারাপ। ডাক্তারের বিধান, গায়ে রোদ লাগাতে হবে। তিনতলায় চারদিকে কাঁচ দিয়ে ঘেরা বিশেষ একটি ঘর তৈরি হল – কিন্তু সেখানে গায়ে রোদ লাগিয়েও কোন উন্নতি হল না। বোঝাই যাচ্ছে, আর রক্ষা নেই – ধীরে ধীরে নিশ্চিত শমন এগিয়ে আসছে। সেই প্রায় আসন্ন শেষ সময়ে – কবি সেই ছাতের ওপর রেণুকাকে আকাশের তারা দেখাচ্ছেন – বোঝাতে চাইছেন ব্রহ্মাণ্ড আর সেই সঙ্গে জীবনের ব্যাপ্তিও কিন্তু অনন্ত। শুধু তাই নয়, বেশ কিছুদিন আগে থেকে – তিনি রেণুকাকে বুঝিয়ে এসেছেন উপনিষদের মন্ত্রের ব্যাখ্যা। জীবনের অন্তিম মুহূর্তে সেই মন্ত্রই শুনতে চেয়েছিলেন রেণুকা । ছোট বোন মীরা দেবী লিখেছেন – “ রাণীদি যাওয়ার সময় বাবার হাত চেপে ধরে বলেছিলেন – বাবা, ওঁ পিতা নোহসি বলো। হাজারীবাগ যাওয়ার আগে অল্প কিছুদিন আমরা শান্তিনিকেতনে ছিলুম। বাবা রোজ সকালবেলায় ওঁকে নিয়ে বারান্দায় এক কোণে বসে উপনিষদ থেকে মন্ত্রপাঠ করে তার মানে বুঝিয়ে দিতেন। এমনি করে ধীরে ধীরে তার মনকে সংসারের বন্ধন থেকে মুক্তি লাভ করার পথে অনেকটা এগিয়ে দিয়েছিলেন, যাতে ছেড়ে যেতে বেশী কষ্ট না পান। এই সময় বাবা যেন রাণীদিকে বেশী কাছে টেনে নিয়েছিলেন।“

রেণুকা বিদায় নিলেন বাংলা ১৩১০ সালের ২রা আশ্বিন, ( ইংরাজি ১৯০৩ সাল – তারিখটি কোথাও পাই ১৪ই সেপ্টেম্বর, কোথাও ১৯শে সেপ্টেম্বর ) মৃণালিনী দেবীর মৃত্যুর মাত্র দশ মাসের মধ্যে। রেণুকার বয়স তখন – ১২ বছর ৮ মাস। যখন বেঁচে ছিল এই মেয়েটি, তখন তাকে সুস্থ করে তুলতে সদ্য স্ত্রী হারানো কবি নানাভাবে চেষ্টা করেছেন, পরিশ্রম করেছেন, রাতে পর রাত তার শয্যাপার্শ্বে অনিমেষ বসে থেকেছেন। কিন্তু শেষে যখন সত্যিই সে বিদায় নিয়ে গেল, তখন এই মৃত্যুকে কেমন শান্তভাবে তিনি গ্রহণ করলেন – তার বর্ণনা আছে প্রশান্ত মহলানবিশের লেখায়। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সূত্রপাতের সময় রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী সে সময় প্রতিদিনই আসতেন জোড়াসাঁকোয়, প্রতিদিনই রেণুকার খবর নিতেন। “ যেদিন মেজ মেয়ে মারা যায়, কথাবার্তায় অনেক দেরী হয়ে গেল। যাওয়ার সময় সিঁড়ির কাছে ত্রিবেদী মশায় কবিকে জিজ্ঞাসা করলেন – আজ কেমন আছে? কবি শুধু বললেন – সে মারা গিয়েছে। ত্রিবেদী মশায় সেদিন কবির মুখের দিকে তাকিয়ে আর কিছু বলতে না পেরে চলে গিয়েছিলেন। “ । এই হচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ – নিজের শোকের লেশমাত্র ভার তিনি চাপান নি সংসারের সচল চাকার ওপর । সব কাজ নীরবে সমাধা করেছেন, ব্যাহত হতে দেন নি কোন কিছুই। এমনকি নিজের থেকে জানাননি অতিথিকেও, তাঁর সঙ্গে অন্য আলোচনা করেছেন স্বাভাবিক ভাবেই। যখন অতিথি
নিজে জানতে চেয়েছেন – একমাত্র তখনই সংবাদটি দিয়েছেন – তাও অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত আর সহজ ভাবে।

শেষ করব রাণীর মৃত্যু আর ‘ পিতা নোহসি “ মন্ত্রটিকে ঘিরে রবীন্দ্রনাথের বক্তব্য দিয়ে। বহু বছর পরে রানি মহলানবিশকে বলেছিলেন – “ সেবার রাণীকে কলকাতায় আনার কিছুদিন পরে তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর ঠিক পূর্ব মুহূর্তে আমাকে বললে – বাবা ‘ পিতা নোহসি ‘ বলো। আমি মন্ত্রটি উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গে তার শেষ নিঃশ্বাস পড়ল । তার জীবনের চরম মুহূর্তে কেন সে ‘ পিতা নোহসি’ স্মরণ করলো – তার ঠিক মানেটা আমি বুঝতে পারি। তার বাবাই যে তার জীবনের সব ছিল, তাই মৃত্যুর হাতে যখন আত্মসমর্পণ করতে হল, তখনো সেই বাবার হাত ধরেই সে দরজাটুকু পার হয়ে যেতে চেয়েছিল। তখনো তার বাবাই একমাত্র ভরসা এবং আশ্রয়। বাবা কাছে আছে জানলে তার আর কোন ভয় নেই। সেইজন্যেই ভগবানকেও পিতা রূপেই কল্পনা করে তাঁর হাত ধরে অজানা পথের ভয় কাটাবার চেষ্টা সে করেছিল ।“

একটু কি বুঝতে পারা গেল পিতা-কন্যার এই নিবিড় অনুভবের জগত আর মৃত্যুর আগে ও পরে সেবক আর সাধক রবীন্দ্রনাথকে ?

পিতা নোহসি
পিতা নো বোধি
নমস্তেহস্তু
মা মা হিংসীঃ।
–শুক্লযজুর্বেদ, ৩৭. ২০
বিশ্বানি দেব সবিতর্দুরিতানি পরাসুব
যদ্ভদ্রং তন্ন আসুব॥
–শুক্লযজুর্বেদ, ৩০. ৩
নমঃ শম্ভবায় চ ময়োভবায় চ
নমঃ শংকরায় চ ময়স্করায় চ
নমঃ শিবায় চ শিবতরায় চ॥
–শুক্লযজুর্বেদ, ১৬. ৪১

তুমি আমাদের পিতা,
তোমায় পিতা বলে যেন জানি,
তোমায় নত হয়ে যেন মানি,
তুমি কোরো না কোরো না রোষ
হে পিতা, হে দেব, দূর করে দাও
যত পাপ যত দোষ–
যাহা ভালো তাই দাও আমাদের
যাহাতে তোমার তোষ।
তোমা হতে সব সুখ হে পিতা,
তোমা হতে সব ভালো–
তোমাতেই সব সুখ হে পিতা,
তোমাতেই সব ভালো।
তুমিই ভালো হে, তুমিই ভালো,
সকল ভালোর সার–
তোমারে নমস্কার হে পিতা,
তোমারে নমস্কার!

সুএ: নেট থেকে

কবির নাম জানা নেই তাই দেয়া গেল না

https://www.facebook.com/groups/rntfc/