রবীন্দ্র জীবনে মৃত্যু : পর্ব ১২ (দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর) (১৯০৫)

রবীন্দ্র জীবনে মৃত্যুপর্ব ১২ দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ( ১৯০৫ )

১৯০৩এর পর ১৯০৫। মহীরূহ পতন ঘটলো জোড়াসাঁকো বাড়ীতে । চলে গেলেন দেবেন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথ যেমন পিতৃহারা হলেন, তেমনই জোড়াসাঁকো বাড়ীও যেন হয়ে গেল অভিভাবকহীন । তবু বলতেই হবে, এতদিন যেভাবে মৃত্যু অকালেই ছিনিয়ে নিয়েছে একের পর এক সম্ভাবনাময় প্রাণ, মহর্ষির মৃত্যু কিন্তু সেই গোত্রের নয়। তিনি চলে গেলেন দীর্ঘ জীবন আস্বাদনের পর, ৮৮ বছর বয়সে। পরিণত বয়সের যে মৃত্যু, দুঃখজনক হলেও – তা অস্বাভাবিক নয়। বরং বলা যেতে পারে – মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের মত এত দীর্ঘ আয়ু ঠাকুর বাড়ীর অন্য অনেকেই পাননি, এমনকি স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও নন।

দেবেন্দ্রনাথের জন্ম ১৮১৭ । পিতা প্রিন্স দ্বারকানাথ সেই সময়ের সমাজে এক উজ্জ্বল তারকা, প্রভুত বিত্তশালী এক বহুমুখী ব্যবসায়ী। একদিকে রাজা রামমোহন, আর অন্যদিকে ইংল্যান্ডের রাণী, ফ্রান্সের রাজা – এঁদের সঙ্গে তাঁর সখ্য। বিলাস ব্যসন আর বৈভবে পূর্ণ তাঁর জীবন। কিন্তু পুত্র দেবেন্দ্রনাথ, এত বৈভবের মধ্যে থেকেও কোথাও যেন একটু আলাদা, অন্তর্মুখী, চিন্তাশীল – একটু যেন ঈশ্বর অন্বেষী। বালক বয়সে নক্ষত্র খচিত অনন্ত আকাশ দেখে তাঁর মনে ভাবনা আসত – ঐ দূরের বিশাল আকাশ যার সৃষ্টি, তিনি কখনই পরিমিত দেবতা নন, তিনি অনন্ত পরমেশ্বর। ( এই ভাবনা থেকেই কি তিনি পুত্র রবীন্দ্রনাথকে চেনাতেন আকাশের তারা, আবার রবীন্দ্রনাথও মৃত্যু পথযাত্রী কন্যা রেনুকাকে দেখাচ্ছেন নক্ষত্র শোভিত সেই বিশাল আকাশ ? )। পিতামহী অলকাসুন্দরীর প্রয়াণ ঘটে ১৮৩৮এ অন্তর্জলি যাত্রার পরে, দেবেন্দ্রনাথ তখন ২১ বছরের যুবক। সেই সময়েই “ মৃত্যুর পূর্বদিন রাত্রিতে আমি…নিমতলার ঘাটে একখানা চাঁচের উপরে বসিয়া আছি। পূর্ণিমার রাত্রি, চন্দ্রোদয় হইয়াছে, নিকটে শ্মশান। তখন দিদিমার নিকট ( পিতামহীকে তিনি দিদিমা ডাকতেন ) নাম সংকীর্তন হইতেছিল… এই অবসরে আমার মনে এক আশ্চর্য উদাসভাব উপস্থিত হইল। আমি যেন আর পূর্বের মানুষ নই। ঐশ্বর্যের উপর একেবারে বিরাগ জন্মিল। যে চাঁচের উপর বসিয়া আছি তাহাই আমার পক্ষে ঠিক বোধ হইল, গালিচা দুলিচা সকল হেয় বোধ হইল, মনের মধ্যে এক অপূর্ব আনন্দ উপস্থিত হইল। “ সম্ভবত এই সময় থেকেই তাঁর জীবন ও মনের পরিবর্তন । ( লিখতে গিয়ে কেমন যেন পুত্র রবীন্দ্রনাথের নির্ঝরের স্বপ্নভগ্ন-র কথা মনে এসে গেল ।)

এই পরিবর্তনের সূত্র ধরেই তিনি আকৃষ্ট হলেন সংস্কৃত সাহিত্য ও অধ্যাত্ম চর্চায়। আশ্রয় করলেন উপনিষদকে। একে একে শুরু হল তত্ত্ববোধিনী সভা, তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা। দীক্ষা নিলেন ব্রাহ্ম ধর্মে, ১৮৪৩এর ২১শে ডিসেম্বর- বাংলা ৭ই পৌষ । শান্তিনিকেতন তখন সুদূর স্বপ্নেও নেই, কিন্তু সূত্রপাত হয়ে গেল সেই দিনটির – যেটি আজকের শান্তিনিকেতনেও অত্যন্ত মর্যাদা ও গুরুত্বের সঙ্গে পালিত হয়ে আসছে। এর পর নানাবিধ কাজকর্মের সঙ্গে শুরু হল তাঁর বিভিন্ন স্থান ভ্রমণ বা পরিক্রমা।তার মধ্যেই ১৮৬৩ সালে এইরকমই একবার ভ্রমণে বেরিয়ে বোলপুরে ভুবনডাঙা গ্রামের শান্ত নির্জন পরিবেশে রায়পুরের সিংহদের কাছ থেকে কুড়ি বিঘে জমি নিয়ে পরে ছোট একতলা একটি বাড়ী নির্মাণ করলেন, নাম দিলেন শান্তিনিকেতন। এক বিশাল মহীরূহের সূচনা হয়েছিল এইভাবেই। ১৮৬৭ সালে ব্রাহ্ম সমাজ তাঁকে মহর্ষি উপাধিতে ভূষিত করল। ১৮৭৩ সালে বালক রবীন্দ্রনাথের উপনয়নের কিছু পরেই তাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন হিমালয়ের উদ্দেশ্যে । আর সেইবারই, সেই ভ্রমণে বেরিয়ে প্রথমেই গেলেন শান্তিনিকেতন। রবীন্দ্রনাথেরও সেই প্রথম শান্তিনিকেতন যাওয়া, বাবা দেবেন্দ্রনাথের হাত ধরেই। তারিখ – সম্ভবত ১৪ই ফেব্রুয়ারী, ১৮৭৩। এই প্রসঙ্গেই পরে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন – “ শান্তিনিকেতনে এসেই আমার জীবনে প্রথম ছাড়া পেয়েছি বিশ্ব প্রকৃতির মধ্যে । …।আমার জীবন নিতান্তই অসম্পূর্ণ থাকত প্রথম বয়সে এই সুযোগ যদি আমার না ঘটত ।“

এরপর এখান থেকেই পিতাপুত্রের হিমালয় যাত্রা ।বালক রবীন্দ্রনাথকে সেই সময় হিমালয়ের ডালহৌসিতে সংস্কৃত, ইংরিজির সাথে সাথে দেবেন্দ্রনাথ পরিচয় করালেন বিশাল নক্ষত্র লোকের সঙ্গে। বিশ্বপ্রকৃতির মধ্যে যে ছাড়া সেবার রবীন্দ্রনাথ পেয়েছিলেন শান্তিনিকেতনে, সেই অনুভূতিই আরো ব্যাপ্ত হল ডালহৌসি পাহাড়ের বক্রোটায় এসে। অনন্ত প্রকৃতির বিশালতার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সেই প্রথম পরিচয় – সেও বাবার হাত ধরেই।

এই ভাবেই ছোট থেকেই পিতা দেবেন্দ্রনাথের সঙ্গে একধরণের মানসিক যোগ তৈরি হয়ে গেল পুত্র রবীন্দ্রনাথের। একবার চন্দননগরে যুবক কবির “ নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে “ গানটি শুনে তাঁর কি প্রতিক্রিয়া হয়েছিল তাই নিয়ে রবীন্দ্রনাথ নিজেই বলেছেন, “ গান গাওয়া যখন শেষ হইল তখন তিনি বলিলেন, দেশের রাজা যদি দেশের ভাষা জানিত ও সাহিত্যের আদর বুঝিত, তবে কবিকে তো তাহারা পুরস্কার দিত। রাজার দিক হইতে যখন তাহার কোনো সম্ভাবনা নাই, তখন আমাকেই সে-কাজ করিতে হইবে।’ এই বলিয়া তিনি একখানি পাঁচশো টাকার চেক আমার হাতে দিলেন।” আবার তারও পরে রবীন্দ্রনাথ যখন নৈবেদ্য লিখছেন, তখন দেবেন্দ্রনাথ তাঁকে ডেকে পাঠিয়ে সেই কবিতাগুলি শুনতে চাইলেন, সঙ্গে নৈবেদ্যর অন্তর্ভুক্ত কিছু গান। শুনতে শুনতে বিমুগ্ধ মহর্ষির চোখে জলের ধারা নেমে এল, বইটি প্রকাশ করার জন্য তখনই কবির হাতে দিলেন কিছু টাকা। বই প্রকাশিত হওয়ার পর দেখা গেল উৎসর্গপত্র –
“এই কাব্যগ্রন্থ
পরম পূজ্যপাদ পিতৃদেবের
শ্রীচরণকমলে উৎসর্গ
করিলাম

এইভাবেই পিতার সঙ্গে পুত্রের যোগাযোগ ঘটেছে বারবার। ব্রহ্মোৎসব সম্পর্কে অনেক রচনা রবীন্দ্রনাথ আগে পিতাকে পড়ে শুনিয়ে পরে পিতার উপদেশ মত প্রয়োজনে সংশোধন করে নিতেন। মহর্ষিও রবীন্দ্রনাথকে হয়ত তাঁর প্রতিভার জন্যেই, জোড়াসাঁকো বাড়ীর সবচাইতে ভাল ভাল ঘর বসবাসের জন্য বরাদ্দ করেছিলেন। এমন কি, পরে সেই বাড়ীর চৌহদ্দির মধ্যেই আলাদা বাড়ী তৈরি করার খরচ দিয়েছিলেন শুধু রবীন্দ্রনাথের জন্যেই, লাল ইটের বাড়ি বলে যাকে বলা হত লাল বাড়ী । অন্যদিকে আবার জমিদারির হিসেব দেওয়ার জন্য, মহর্ষি কলকাতায় থাকলে প্রতি মাসের দু তারিখে রবীন্দ্রনাথকে খাতাপত্র নিয়ে পিতার কাছে গিয়ে দাঁড়াতে হত। ওই দিনটাকে রবীন্দ্রনাথ যে খুব ভয় পেতেন – তা রথীন্দ্রনাথের লেখা থেকে জানা যায়।

যাই হোক, দেবেন্দ্র-রবীন্দ্র সম্পর্ক নিয়ে আর বেশি কিছু না বলে সরাসরি চলে আসা যাক দেবেন্দ্রনাথের শেষের দিনগুলির কথায়। তখন তাঁর সোজা হয়ে বসতে কষ্ট হত, বাঁ দিকে কাত হয়ে বসতেন। অ্যাবসেস হয়েছিল, তাই অপারেশন করতে হল। সেইসময় রোজ সকালে সূর্য প্রণাম করতেন দেবেন্দ্রনাথ, পুব দিকের ছাদে গিয়ে সূর্য দর্শন করে চুপ করে বসে থাকতেন । ( পরে এই অভ্যাস আমারা রবীন্দ্রনাথের মধ্যেও দেখেছি )। অপারেশনের পরের দিনও রেলিং ধরে হেঁটে হেঁটে কষ্ট করে সূর্য প্রনাম সেরে এলেন। এইসময় দেবেন্দ্রনাথ প্রায়ই বলতেন যে, তিনি স্বপ্ন দেখেন যে দেবদূতরা তাঁকে নিতে এসেছে। এইভাবেই এসে গেল ১৯০৫এর ১৯শে জানুয়ারি। আশঙ্কাজনক অবস্থায় শুয়ে আছেন – রবীন্দ্রনাথ পাশে এসে বসলেন। পিতা মাথাটি একটু হেলিয়ে দিলেন পুত্রের দিকে, যেন কিছু শুনতে চান। সেদিন সকালে উপাসনা করতে পারেন নি, তাই হয়ত মন্ত্র শুনতে চাইলেন পুত্রের কাছে। রবীন্দ্রনাথ কানের কাছে গিয়ে মন্ত্র পড়েন, অসতো মা সদ্গময়…, অমৃত পথ যাত্রী দেবেন্দ্রনাথ উৎকীর্ণ হয়ে শুনতে থাকেন। তারপর ধীরে ধীরে তাঁর দৃষ্টি স্থির হয়ে এল, কন্যা সৌদামিনী অনেক কষ্টে মুখে দিলেন এক চামচ দুধ – দেবেব্দ্রনাথ বলে উঠলেন – “ বাতাস, বাতাস “। হাতপাখা দিয়ে জোরে হাওয়া করা শুরু হল, তিনি অস্ফুট ভাবে বললেন “ আমি বাড়ী যাব “। এরপরেই বিদায় নিলেন – ঘড়িতে তখন দুপুর একটা পঞ্চান্ন।

অসতো মা সদ্‌গময়
তমসো মা জ্যোতির্গময়
মৃত্যোর্মামৃতং গময়।
আবিরাবীর্ম এধি।
রুদ্র যত্তে দক্ষিণং মুখং
তেন মাং পাহি নিত্যম্‌।

অসত্য হইতে আমাকে সত্যে লইয়া যাও, অন্ধকার হইতে আমাকে জ্যোতিতে লইয়া যাও, মৃত্যু হইতে আমাকে অমৃতে লইয়া যাও। হে স্বপ্রকাশ, আমার নিকটে প্রকাশিত হও। রুদ্র, তোমার যে প্রসন্ন মুখ, তাহার দ্বারা আমাকে সর্বদাই রক্ষা করো।

সুএ: নেট থেকে

কবির নাম জানা নেই তাই দেয়া গেল না

https://www.facebook.com/groups/rntfc/