রবীন্দ্র জীবনে মৃত্যু : পর্ব ৩ (গণেন্দ্রনাথ ঠাকুর)

শুরু করেছিলাম রবীন্দ্রনাথের মা সারদা দেবীকে দিয়ে, সন্তানের জীবনে মায়ের গুরুত্বের কথা মনে রেখে । কিন্তু এখন একটু পিছিয়ে গিয়ে বলব রবীন্দ্রনাথের খুড়তুতো দাদা গণেন্দ্রনাথের কথা। তিনি ছিলেন প্রিন্স দ্বারকানাথের চতুর্থ সন্তান গিরীন্দ্রনাথের জ্যেষ্ঠ পুত্র । রবীন্দ্রনাথের চাইতে তিনি ছিলেন ২০ বছরের বড়, জন্ম ১৮৪১ সালে। চলেও গিয়েছিলেন মাত্র ২৮ বছর বয়সে ১৮৬৯ সালে, কলেরায় আক্রান্ত হয়ে। কিন্তু এর মধ্যেই তিনি স্থান করে নিয়েছিলেন ঠাকুর বাড়ীর সাংস্কৃতিক কার্যকলাপে। হিন্দু স্কুলের কৃতি ছাত্র গনেন্দ্রনাথ ১৮৫৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এন্ট্রান্স পাশ করেন, সম্ভবত তিনি ছিলেন এন্ট্রান্সের প্রথম বর্ষের ছাত্র। এর কিছুদিন পরেই ১৮৬৫ সালে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, গুণেন্দ্রনাথ আর অন্যান্যদের সঙ্গে মিলে তিনি পত্তন করেন জোড়াসাঁকো নাট্যশালা আর সেই বছরেই মঞ্চস্থ করেন মাইকেল মধুসূদনের কৃষ্ণ কুমারী নাটক । এরপরেই তিনি ভাল বাংলা নাটক সৃষ্টিতে উতসাহ দিতে একটি পুরস্কার চালু করেন। তার দুবছর পর ১৮৬৭ সালে দ্বিজেন্দ্রনাথ, রাজনারায়ন বসু আর নবগোপাল মিত্রের সঙ্গে একসঙ্গে তিনি শুরু করেন হিন্দু মেলা – স্বদেশী জাগরণের আর স্বদেশী শিল্পের আদর্শে উদ্বুদ্ধ সেই মেলার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হন গণেন্দ্রনাথ নিজেই । এই উপলক্ষেই তিনি বেশ কিছু ব্রহ্মসঙ্গীত রচনা করেছিলেন – যেগুলি বিভিন্ন সময়ে হিন্দুমেলায় গাওয়া হত। ব্রহ্ম সঙ্গীতের পাশাপাশি তিনি তখন কালিদাসের বিক্রমোর্বশী নাটকের অনুবাদও রচনা করছেন। রবীন্দ্রনাথ তখন খুবই ছোট, কিন্তু সেই অল্প বয়সেই গণেন্দ্রনাথের সাংগঠনিক তাঁর মনে গভীর ভাবে রেখাপাত করে – যা অনেক পরে প্রতিফলিত হয় তাঁর জীবন স্মৃতির পাতায়। লেখাটি পড়লেই বুঝতে পারা যায়, মাত্র আট বছর বয়সে যে খুড়তুতো দাদাকে তিনি হারিয়েছিলেন, সেই গণেন্দ্রদাদা কতখানি প্রভাব বিস্তার করেছিলেন বালক রবীন্দ্রনাথের মনে।…..

“ … ছেলেবেলার আমার একটা মস্ত সুযোগ এই যে, বাড়িতে দিনরাত্রি সাহিত্যের হাওয়া বহিত। মনে পড়ে, খুব যখন শিশু ছিলাম বারান্দার রেলিং ধরিয়া এক-একদিন সন্ধ্যার সময় চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া থাকিতাম। সম্মুখের বৈঠকখানাবাড়িতে আলো জ্বালিতেছে, লোক চলিতেছে দ্বারে বড়ো বড়ো গাড়ি আসিয়া দাঁড়াইতেছে। কী হইতেছে ভালো বুঝিতাম না কেবল অন্ধকারে দাঁড়াইয়া সেই আলোকমালার দিকে তাকাইয়া থাকিতাম। মাঝখানে ব্যবধান যদিও বেশি ছিল না তবুও সে আমার শিশুজগৎ হইতে বহুদুরের আলো। আমার খুড়তুত ভাই গণেন্দ্রদাদা তখন রামনারায়ণ তর্করত্নকে দিয়া নবনাটক লিখাইয়া বাড়িতে তাহার অভিনয় করাইতেছেন। সাহিত্য এবং ললিতকলায় তাঁহার উৎসাহের সীমা ছিল না। বাংলার আধুনিক যুগকে যেন তাঁহারা সকল দিক দিয়াই উদ্‌বোধিত করিবার, চেষ্টা করিতেছিলেন। বেশে-ভূষায় কাব্যে-গানে চিত্রে-নাট্যে ধর্মে-স্বাদেশিকতায়, সকল বিষয়েই তাঁহাদের মনে একটি সর্বাঙ্গসম্পূর্ণ জাতীয়তার আদর্শ জাগিয়া উঠিতেছিল। পৃথিবীর সকল দেশের ইতিহাসচর্চায় গণদাদার অসাধারণ অনুরাগ ছিল। অনেক ইতিহাস তিনি বাংলায় লিখিতে আরম্ভ করিয়া অসমাপ্ত রাখিয়া গিয়াছেন। তাঁহার রচিত বিক্রমোর্বশী নাটকের একটি অনুবাদ অনেকদিন হইল ছাপা হইয়াছিল। তাঁহোর রচিত ব্রহ্মসংগীতগুলি এখনো ধর্মসংগীতে শ্রেষ্ঠ স্থান অধিকার করিয়া আছে।
গাও হে তাঁহার নাম
রচিত যাঁর বিশ্বধাম,
দয়ার যাঁর নাহি বিরাম
ঝরে অবিরত ধারে–
বিখ্যাত গানটি তাঁহারই। বাংলায় দেশানুরাগের গান ও কবিতার প্রথম সূত্রপাত তাঁহারাই করিয়া গিয়াছেন। সে আজ কতদিনের কথা যখন গণদাদার রচিত “লজ্জায় ভারতযশ গাহিব কী করে’ গানটি হিন্দুমেলায় গাওয়া হইত । যুবাবয়সেই গণদাদার যখন মৃত্যু হয় তখন আমার বয়স নিতান্ত অল্প। কিন্তু তাঁহার সেই সৌম্যগম্ভীর উন্নত গৌরকান্ত দেহ একবার দেখিলে আর ভুলিবার জো থাকে না। তাঁহার ভারি একটা প্রভাব ছিল। সে-প্রভাবটি সামাজিক প্রভাব। তিনি আপনার চারি দিকের সকলকে টানিতে পারিতেন, বাঁধিতে পারিতেন–তাঁহার আকর্ষণের জোরে সংসারের কিছুই যেন ভাঙিয়াচুরিয়া বিশ্লিষ্ট হইয়া পড়িতে পারিত না।
আমাদের দেশে এক-একজন এইরকম মানুষ দেখিতে পাওয়া যায়। তাঁহার চরিত্রের একটি বিশেষ শক্তিপ্রভাবে সমস্ত পরিবারের অথবা গ্রামের কেন্দ্রস্থলে অনায়াসে অধিষ্ঠিত হইয়া থাকেন। ইহারাই যদি এমন দেশে জন্মিতে যেখানে রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে বাণিজ্যব্যবসায়ে ও নানাবিধ সর্বজনীন কর্মে সর্বদাই বড়ো বড়ো দল বাঁধা চলিতেছে তবে ইহারা স্বভাবতই গণনায়ক হইয়া উঠিতে পারিতেন। বহুমানবকে মিলাইয়া এক-একটি প্রতিষ্ঠান রচনা করিয়া তোলা বিশেষ একপ্রকার প্রতিভার কাজ। আমাদের দেশে সেই প্রতিভা কেবল এক-একটি বড়ো বড়ো পরিবারে মধ্যে অখ্যাত ভাবে আপনার কাজ করিয়া বিলুপ্ত হইয়া যায়। আমার মনে হয়, এমন করিয়া শক্তির বিস্তর অপব্যয় ঘটে– এ যেন জ্যোতিষ্কলোক হইতে নক্ষত্রকে পাড়িয়া তাহার দ্বারা দেশলাইকাঠির কাজ উদ্ধার করিয়া লওয়া। “

রবীন্দ্রনাথ তাঁর মধ্যে এক গণ নায়কের সম্ভাবনা দেখেছিলেন। তাঁর এই লেখায় সাংগঠনিক প্রতিভা সম্পন্ন একজন তরুণের অকাল মৃত্যুতে যে আক্ষেপ ধ্বনিত হয়েছে, তাতে আমরাও সহজেই অনুমান করে নিতে পারি, গনেন্দ্রনাথ যদি দীর্ঘ জীবন পেতেন, তাহলে দেশ আর সমাজে ঠাকুর বাড়ীর এই কৃতি সন্তান হয়ত আরো অনেক বড় কোন অবদান রেখে যেতে পারতেন – ভাগ্যের নিষ্ঠুর পরিহাসে যা সম্ভব হল না ।

 সুএ: নেট থেকে

কবির নাম জানা নেই তাই দেয়া গেল না

https://www.facebook.com/groups/rntfc/

Leave a Reply