রবীন্দ্র জীবনে মৃত্যু : পর্ব ৪ (গুণেন্দ্রনাথ ঠাকুর)

এর আগে বলেছি গণেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা, এবারে আসছি তাঁরই ছোট ভাই গুণেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথায়।নামে আর উচ্চারণে অনেকখানি মিল থাকার কারণে অনেকেরই অনেক সময় একটু ভুল হয়ে যায় এই দুজনের মধ্যে। এঁরা দুজনেই ছিলেন প্রিন্স দ্বারকানাথের অন্যতম পুত্র গিরীন্দ্রনাথের সন্তান। অর্থাৎ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের কাকার ছেলে, মানে খুড়তুতো দাদা। বংশ তালিকার এদিক থেকেই গগনেন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথের ধারা শুরু। কারণ, বড় ভাই গণেন্দ্রনাথ নিঃসন্তান ছিলেও ছোট ভাই গুণেন্দ্রনাথেরই সন্তান – গগনেন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথ। গিরীন্দ্রনাথের সময়েই বংশের এই দুটি ধারার ( গিরীন্দ্রনাথ আর দেবেন্দ্রনাথ ) বাসস্থান পৃথক হয়ে যায় – জোড়াসাঁকোরই ৫ আর ৬ নম্বর বাড়ীর মধ্যে। তবে বাড়ী পৃথক হলেও সম্পর্কের দিক থেকে তাঁরা সবাই ছিলেন খুব ঘনিষ্ঠ, গুণেন্দ্রনাথ ছিলেন রবীন্দ্রনাথের প্রিয় “ গুণদাদা “ – রবীন্দ্রনাথের চাইতে ১৪ বছরের বড় ( জন্ম – ১৮৪৭ ) জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরবাড়ীতে যখন জোড়াসাঁকো থিয়েটারের সূচনা করেন, তখন এই গুণেন্দ্রনাথই ছিলেন তাঁর অন্যতম সঙ্গী ।ঠাকুর পরিবারের বংশগত ধারা অনুযায়ী থিয়েটার, গান বাজনার চর্চা ছাড়াও গুণেন্দ্রনাথের আরো শখ ছিল বাগান করার। জোড়াসাঁকোর ৫ নম্বর বাড়ীর সামনে তাঁর তৈরি করা সুন্দর বাগান ছিল দেশ বিদেশের নানা গাছে ভর্তি । সেই সঙ্গে ছিল তাঁর পাখীর শখ। পাখী তিনি পুষতেন, কিন্তু খাঁচায় রেখে নয়। বাগানে এনে তাদের মুক্ত করে দিতেন, তারা উড়ে বেড়াত এ গাছ থেকে ও গাছে। এইভাবে জোড়াসাঁকো বাড়ী তখন ভরে উঠেছিল নানা রকমের গাছ গাছালির সঙ্গে নানা ধরনের পাখীতেও – সাদা বুলবুলি, লাল বুলবুলি, টিয়া, বৌ কথা কও, দোয়েল, কোকিল – এমন অনেক পাখীতে সেই বাড়ীর পরিবেশেই একটা আশ্চর্য প্রকৃতির ছোঁয়া লেগেছিল। স্বাভাবিক ভাবেই তরুণ রবীন্দ্রনাথেরও তিনি একজন অত্যন্ত প্রিয় দাদা ছিলেন। তাই জীবন স্মৃতিতে আমরা পাই – “গুণদাদাকে বেশ মনে পড়ে। তিনিও বাড়িটিকে একেবারে পূর্ণ করিয়া রাখিয়াছিলেন। আত্মীয়বন্ধু আশ্রিত-অনুগত অতিথি-অভ্যাগতকে তিনি আপনার বিপুল ঔদার্যের দ্বারা বেষ্টন করিয়া ধরিয়াছিলেন। তাঁহার দক্ষিণের বারান্দায়, তাঁহার দক্ষিণের বাগানে, পুকুরের বাঁধা ঘাটে মাছ ধরিবার সভায়, তিনি মূর্তিমান দাক্ষিণ্যের মতো বিরাজ করিতেন। সৌন্দর্যবোধ ও গুণগ্রাহিতায় তাঁহার নধর শরীর-মনটি যেন ঢলঢল করিতে থাকিত। নাট্যকৌতুক আমোদ-উৎসবের নানা সংকল্প তাঁহাকে আশ্রয় করিয়া নব নব বিকাশলাভের চেষ্টা করিত। শৈশবের অনধিকারবশত তাঁহাদের সে-সমস্ত উদ্‌যোগের মধ্যে আমরা সকল সময়ে প্রবেশ করিতে পাইতাম না– কিন্তু উৎসাহের ঢেউ চারি দিক হইতে আসিয়া আমাদের ঔৎসুক্যের উপরে কেবলই ঘা দিতে থাকিত।……মধ্যাহ্নে আহারের পর গুণদাদা এ বাড়িতে কাছারি করিতে আসিতেন, কাছারি তাঁহাদের একটা ক্লাবের মতোই ছিল– কাজের সঙ্গে হাস্যালাপের বড়োবেশি বিচ্ছেদ ছিল না গুণদাদা কাছারিঘরে একটা কৌচে হেলান দিয়ে বসিতেন– সেই সুযোগে আমি আস্তে আস্তে তাঁহার কোলের কাছে আসিয়া বসিতাম। তিনি প্রায় আমাকে ভারতবর্ষের ইতিহাসের গল্প বলিতেন।” বোঝাই যায় – কিশোর রবীন্দ্রনাথের ওপর খুব ভাল প্রভাব ছিল এই গুণ দাদার। তাই আর এক জায়গায় তিনি লিখেছেন – “ একটা নিতান্ত সামান্য ঘটনায় আমার প্রতি গুণদাদার স্নেহকে আমি কিরূপ বিশেষ ভাবে উদ্‌বোধিত করিয়াছিলাম সে কথা আমার মনে পড়িতেছে। ইস্কুলে আমি কোনোদিন প্রাইজ নাই, একবার কেবল সচ্চরিত্রের পুরস্কার বালিয়া একখানা ছন্দোমালা বই পাইয়াছিলাম। আমাদের তিনজনের মধ্যে সত্যই পড়াশুনায় সেরা ছিল। সে কোন-একবার পরীক্ষায় ভালোরূপ পাস করিয়া একটা প্রাইজ পাইয়াছিল, সেদিন ইস্কুল হইতে ফিরিয়া গাড়ি হইতে নামিয়াই দৌড়িয়া গুণদাদাকে খবর দিতে চলিলাম। তিনি বাগানে বসিয়া ছিলেন। আমি দূর হইতেই চীৎকার করিয়া ঘোষণা করিলাম, “গুণদাদা, সত্য প্রাইজ পাইয়াছে”। তিনি হাসিয়া আমাকে কাছে টানিয়া লইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুমি প্রাইজ পাও নাই?” আমি কহিলাম, “না, আমি পাই নাই, সত্য পাইয়াছে।” ইহাতে গুণদাদা ভারি খুশি হইলেন। আমি নিজে প্রাইজ না পাওয়া সত্ত্বেও সত্যের প্রাইজ পাওয়া লইয়া এত উৎসাহ করিতেছি, ইহা তাঁহার কাছে বিশেষ একটা সদ্‌গুণের পরিচয় বলিয়া মনে হইল। তিনি আমার সামনেই সে কথাটা অন্য লোকের কাছে বলিলেন। এই ব্যাপারের মধ্যে কিছুমাত্র গৌরবের কথা আছে, তাহা আমার মনেও ছিল না-হঠাৎ তাঁহার কাছে প্রশংসা পাইয়া আমি বিস্মিত হইয়া গেলাম। এইরূপে আমি প্রাইজ না পাওয়ার প্রাইজ পাইলাম ………”। এইভাবেই রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে গুণেন্দ্রনাথের একটি আত্মিক সম্পর্ক রচিত হয়, যা সম্ভবত রবীন্দ্রনাথের মানসিক বিকাশের পক্ষেও কিছু সহায়ক হয়েছিল। এই গুণেন্দ্রনাথেরও মৃত্যু মাত্র ৩৪ বছর বয়সে – ১৮৮১ সালের ৩রা জুন। রবীন্দ্রনাথ তখন মাত্র কুড়ি । দাদা-ভাইয়ের একটা সুন্দর মেলবন্ধনেরও দুঃখজনক সমাপ্তি ঘটেছিল সেদিন।

সুএ: নেট থেকে

কবির নাম জানা নেই তাই দেয়া গেল না

https://www.facebook.com/groups/rntfc/