রবীন্দ্র জীবনে মৃত্যু : পর্ব ৫ (কাদম্বরী দেবী) (এপ্রিল ১৮৮৪)

( এই পর্বটি একটু দীর্ঘ হয়েছে, রবীন্দ্রনাথেরই বিভিন্ন রচনার অংশ বিশেষ থেকে তাঁর জীবনে ও মনে কাদম্বরী দেবীর প্রভাব তুলে ধরতে গিয়ে। পাঠকদের ধৈর্যের ওপর যদি চাপ পড়ে – তাই আগেই ক্ষমা চেয়ে রাখলাম )

গুণেন্দ্রনাথ চলে গেলেন ১৮৮১ তে। আর তার তিন বছর পরেই এল সেই বিশাল আঘাত, যা রবীন্দ্রনাথের জীবনে চিরদিনের মত এক গভীর ছাপ রেখে গেল।

অনেকদিন আগে, ১৮৬৮ সালের জুলাই মাসের ৫ তারিখে এক বালিকা নববধু জোড়াসাঁকো বাড়ীতে প্রবেশ করেছিল বালক রবির নতুন দাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথের হাত ধরে। প্রসঙ্গত তার জন্মও ঐ একই তারিখে ১৮৫৯এর ৫ই জুলাই )। সেই নববধূর বয়স তখন নয়, আর রবীন্দ্রনাথ সাত। সেই বালক বয়সে, পরিবারে সেই নতুন মানুষের আগমনের ছবি রবীন্দ্রনাথ অনেক পরে আঁকলেন খুব সুন্দর ভাষায় – “এমন সময় একদিন বাজল সানাই বারোয়াঁ সুরে। বাড়িতে এল নুতন বৌ, কচি শামলা হাতে সরু সোনার চুড়ি। পলক ফেলতেই ফাঁক হয়ে গেল বেড়া, দেখা দিল চেনাশোনার বাহির সীমানা থেকে মায়াবী দেশের নতুন মানুষ। দূরে দূরে ঘুরে বেড়াই, সাহস হয় না কাছে আসতে। ও এসে বসেছে আদরের আসনে, আমি যে হেলাফেলার ছেলেমানুষ। “ দুজনেই প্রায় সমবয়সী, বয়সের তফাৎ দু বছরও নয়, তাই রবির অবুঝ শিশুমনে কোথায় যেন একটু ভয় – নতুনের পাশে নিজের আদর কমে যাবে না তো ? । কারণ, – “দিদি বেড়াচ্ছিলেন ছাদের উপর নতুন বৌকে পাশে নিয়ে, মনের কথা বলাবলি চলছিল। আমি কাছে যাবার চেষ্টা করতেই এক ধমক। এ পাড়া যে ছেলেদের দাগকাটা গণ্ডির বাইরের। আবার শুকনো মুখ করে ফিরতে হবে সেই ছ্যাৎলাপড়া পুরোনো দিনের আড়ালে। “ কিন্তু কোথায় কি ? সেই বেড়া, সেই আড়াল তো আর রইল না । কারণ, – “হঠাৎ দূর পাহাড় থেকে বর্ষার জল নেমে সাবেক বাঁধের তলা খইয়ে দেয়, এবার তাই ঘটল। বাড়িতে নতুন আইন চালালেন কর্ত্রী। বৌঠাকরুনের জায়গা হল বাড়ি-ভিতরের ছাদের লাগাও ঘরে। সেই ছাদে তাঁরই হল পুরো দখল। পুতুলের বিয়েতে ভোজের পাতা পড়ত সেইখানে। নেমন্তন্নের দিনে প্রধান ব্যক্তি হয়ে উঠত এই ছেলেমানুষ। বৌঠাকরুন রাঁধতে পারতেন ভালো, খাওয়াতে ভালোবাসতেন, এই খাওয়াবার শখ মেটাতে আমাকে হাজির পেতেন। ইস্কুল থেকে ফিরে এলেই তৈরি থাকত তাঁর আপন হাতের প্রসাদ। চিংড়িমাছের চচ্চ্‌ড়ির সঙ্গে পানতা ভাত যেদিন মেখে দিতেন অল্প একটু লঙ্কার আভাস দিয়ে, সেদিন আর কথা ছিল না। মাঝে মাঝে যখন আত্মীয়-বাড়িতে যেতেন, ঘরের সামনে তাঁর চটিজুতোজোড়া দেখতে পেতুম না, তখন রাগ করে ঘরের থেকে একটা-কোনো দামি জিনিস লুকিয়ে রেখে ঝগড়ার পত্তন করতুম। বলতে হত, “তুমি গেলে তোমার ঘর সামলাবে কে। আমি কি চৌকিদার।’ তিনি রাগ দেখিয়ে বলতেন, “তোমাকে আর ঘর সামলাতে হবে না, নিজের হাত সামলিয়ো।’ শুরু হল – বালক কবির নতুন বন্ধুত্ব, নতুন সঙ্গ, নতুন স্নেহ। “এইবার আমার নির্জন-বেদুয়িনি ছাদে শুরু হল আর-এক-পালা–এল মানুষের সঙ্গ, মানুষের স্নেহ।…ছাদের রাজ্যে নতুন হাওয়া বইল, নামল নতুন ঋতু। “ । যার আগমনে একদিন ভেবেছিলেন “ও এসে বসেছে আদরের আসনে, আমি যে হেলাফেলার ছেলেমানুষ।“ – তার স্নেহস্পর্শই রবীন্দ্রনাথকে উত্তীর্ণ করল এক নতুন ভাল লাগার জগতে। বিকশিত হলেন রবীন্দ্রনাথের নতুন বৌঠান – কাদম্বরী দেবী, প্রভাত মুখোপাধ্যায়ের ভাষায়, রবীন্দ্রনাথের জীবনে যাঁর ভুমিকা “কল্যাণী ধ্রুবতারার মত নিঃস্পন্দ, নির্নিমিখ”। প্রিন্স দ্বারকানাথের মামাতো বোন শিরোমণির স্বামী জগন্মোহন গাঙ্গুলির পুত্র শ্যামলাল গাঙ্গুলির মেয়ে কাদম্বরী – মাত্র ন বছর বয়সে জোড়াসাঁকোয় নববধূ হিসেবে প্রবেশ করেও ধীরে ধীরে হয়ে উঠলেন সেই বাড়ীর যোগ্যতমা বধূ। সাহিত্যপ্রেমে, অভিনয়ে, রান্নাবান্নায়, গানে, ভারতীর মত পত্রিকার দেখভালে, অন্যদের প্রতি ব্যবহারে, এমনকি বাইরের জগতে ঘোড়ায় চড়ে বেড়াতে যাওয়ায় – তিনি ছিলেন সবদিকেই এক বিস্ময় । ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলের যা কিছু দান – সবেতেই জড়িয়ে আছেন তিনি। চিত্রা দেব বলেছেন “ কিশোর রবীন্দ্রনাথের সৌন্দর্য বোধকে সবচেয়ে উঁচুতারে বেধে দিয়েছিলেন এই কাদম্বরী, বাইরে থেকে এসে এ বাড়ীর প্রাণপুরুষকে জাগিয়ে দিতে তিনি যতখানি সফল হয়েছিলেন, আর কেউ তা পারেনি।“ রবীন্দ্রনাথের সেই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠার দিনগুলি নিয়ে তিনি নিজেই পরে সুন্দর ভাবে বলেছেন – “ছাদটাকে বৌঠাকরুন একেবারে বাগান বানিয়ে তুলেছিলেন। পিল্পের উপরে সারি সারি লম্বা পাম গাছ, আশেপাশে চামেলি গন্ধরাজ রজনীগন্ধা করবী দোলনচাঁপা। ছাদ-জখমের কথা মনেই আনেন নি, সবাই ছিলেন খেয়ালি।…ছাদের ঘরে এল পিয়ানো। আর এল একালের বার্নিশকরা বৌবাজারের আসবাব। বুকের ছাতি উঠল ফুলে। গরিবের চোখে দেখা দিল হাল-আমলের সস্তা আমিরি।… বৌঠাকরুন গা ধুয়ে চুল বেঁধে তৈরি হয়ে বসতেন। গায়ে একখানা পাতলা চাদর উড়িয়ে আসতেন জ্যোতিদাদা, বেহালাতে লাগাতেন ছড়ি, আমি ধরতুম চড়া সুরের গান। গলায় যেটুকু সুর দিয়েছিলেন বিধাতা তখনও তা ফিরিয়ে নেন নি। সূর্য-ডোবা আকাশে ছাদে ছাদে ছড়িয়ে যেত আমার গান। হু হু করে দক্ষিণে বাতাস উঠত দূর সমুদ্র থেকে, তারায় তারায় যেত আকাশ ভ’রে।“…আরও বলেছেন – “তর্কে বৌঠাকরুনের কাছে বরাবর হেরেছি, কেননা তিনি তর্কের জবাব দিতেন না; আর হেরেছি দাবাখেলায়, সে খেলায় তাঁর হাত ছিল পাকা… । আবার রবীন্দ্রনাথের লেখাকে, গানকে আরো উন্নত করে তোলার চেষ্টায় তুলনা টেনে আনতেন অন্যদের সঙ্গে – “ রবি সবচাইতে কালো, দেখতে একেবারেই ভালো নয়, গলা যেন কিরকম। ও কোনদিন গাইতে পারবে না, ওর চাইতে সত্য ভাল গায় “। কিংবা আত্মীয়রা যখন কিশোর রবির সম্পর্কে বলছেন – “ছেলেটির লেখবার হাত আছে।তখন বৌঠাকরুনের ব্যবহার ছিল উলটো। কোনোকালে আমি যে লিখিয়ে হব, এ তিনি কিছুতে মানতেন না। কেবলই খোঁটা দিয়ে বলতেন, কোনোকালে বিহারী চক্রবর্তীর মতো লিখতে পারব না। “ আসলে এসবই ছিল কিশোর রবিকে ভবিষ্যতের রবীন্দ্রনাথ করে তোলার প্রচেষ্টা ।এইভাবেই, ধীরে ধীরে সখ্য গড়ে উঠেছে তাঁর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের, তিনি হয়ে উঠেছেন তাঁর প্রেরণাদাত্রী।আর এই যে, নতুন বৌঠানের হাতে তাঁর নিজের গড়ে ওঠা এ নিয়েও দারুণ সুন্দর করে বলেছেন তিনি – “আমি তার সতেরো বছরের জানা।কত আসা যাওয়া, কত দেখাদেখি, কত বলাবলি; তারই আশেপাশে কত স্বপ্ন, কত অনুমান, কত ইশারা; তারই সঙ্গে সঙ্গে কখনো বা ভোরের ভাঙা ঘুমে শুকতারার আলো, কখনো বা আষাঢ়ের ভরসন্ধ্যায় চামেলিফুলের গন্ধ, কখনো বা বসন্তের শেষ প্রহরে ক্লান্ত নহবতের পিলুবারোয়াঁ; সতেরো বছর ধরে এই-সব গাঁথা পড়েছিল তার মনে।আর, তারই সঙ্গে মিলিয়ে সে আমার নাম ধরে ডাকত। ঐ নামে যে মানুষ সাড়া দিত সে তো একা বিধাতার রচনা নয়। সে যে তারই সতেরো বছরের জানা দিয়ে গড়া; কখনো আদরে কখনো অনাদরে, কখনো কাজে কখনো অকাজে, কখনো সবার সামনে কখনো একলা আড়ালে, কেবল একটি লোকের মনে মনে জানা দিয়ে গড়া সেই মানুষ।“। ( ১৮৬৮ তে কাদম্বরী দেবীর বিবাহ থেকে ১৮৮৪ তে তাঁর মৃত্যু – প্রায় সতের বছরের কাছাকাছি সময়)।

এই সময়ের মধ্যেই কবি দাদা বৌদির সঙ্গে একসঙ্গে গেছেন – চন্দননগরে গঙ্গাতীরে মোরান সাহেবের বাড়ীতে, সদর স্ট্রীটের বাড়ীতে, দার্জিলিঙে । আর এই একসঙ্গে থাকা ও ঘোরার সময়েই রচিত হচ্ছে বৌ ঠাকুরানীর হাট, বিবিধ প্রসঙ্গ, নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ । পাশে থাকছেন – নতুন বৌঠান কাদম্বরী । তরুণ কবি লিখছেন – “আমার পাঠকদিগের মধ্যে একজন লোককে বিশেষ করিয়া আমার এই ভাবগুলি উৎসর্গ করিতেছি । — এ ভাবগুলির সহিত তোমাকে আরও কিছু দিলাম , সে তুমিই দেখিতে পাইবে! সেই গঙ্গার ধার মনে পড়ে? সেই নিস্তব্ধ নিশীথ? সেই জ্যোৎস্নালোক? সেই দুই জনে মিলিয়া কল্পনার রাজ্যে বিচরণ? সেই মৃদু গম্ভীর স্বরে গভীর আলোচনা? সেই দুই জনে স্তব্ধ হইয়া নীরবে বসিয়া থাকা? সেই প্রভাতের বাতাস,সেই সন্ধ্যার ছায়া! এক দিন সেই ঘনঘোর বর্ষার মেঘ,শ্রাবণের বর্ষণ, বিদ্যাপতি গান? তাহারা সব চলিয়া গিয়াছে ! কিন্তু আমার এই ভাবগুলির মধ্যে তাহাদের ইতিহাস লেখা রহিল । এই লেখাগুলির মধ্যে কিছু দিনের গোটাকতক সুখ দুঃখ লুকাইয়া রাখিলাম,এক-একদিন খুলিয়া তুমি তাহাদের স্নেহের চক্ষে দেখিও, তুমি ছাড়া আর কেহ তাহাদিগকে দেখিতে পাইবে না! আমার এই লেখার মধ্যে লেখা রহিল — এক লেখা তুমি আমি পড়িব, আর এক লেখা আর সকলে পড়িবে ।“ – এ সবই সেই চন্দননগরের স্মৃতির ছোঁয়া কি ?

এত কথা এভাবে বলার কারণই হচ্ছে রবীন্দ্রনাথের জীবনে কাদম্বরী দেবীর জীবনব্যাপী প্রভাব।আবার এর মধ্যেই রবীন্দ্রনাথের বিবাহ হচ্ছে ১৮৮৩র ডিসেম্বরে।কিন্তু সেই বিয়ের মাত্র চার মাসে মধ্যে ১৮৮৪ সালের এপ্রিল মাসে কাদম্বরী যখন আকস্মিক ভাবে নিজের হাতে নিজের জীবনের যাত্রা সমাপ্ত করে দিলেন আফিম খেয়ে ( তাঁর চলে যাওয়ার তারিখ কোথাও আছে ১৯শে এপ্রিল, কোথাও ২১শে । অনেকে বলেন ১৯ তারিখে আফিম গ্রহণ করার পর দুদিন প্রায় অচৈতন্য থাকার পর ২১শে এপ্রিল ১৮৮৪ সালে তাঁর জীবনাবসান হয় ), তখন এক অসম্ভব আঘাতের সম্মুখে এসে দাঁড়ালেন কবি। আবার কিছুদিন একটু যেন অসংলগ্ন আচরণও করলেন – যা সবই তাঁর নিজের লেখাতেই স্পষ্ট – “ আমার চব্বিশবছর বয়সের সময় মৃত্যুর সঙ্গে যে পরিচয় হইল তাহা স্থায়ী পরিচয়। তাহা তাহার পরবর্তী প্রত্যেক বিচ্ছেদশোকের সঙ্গে মিলিয়া অশ্রুর মালা দীর্ঘ করিয়া গাঁথিয়া চলিয়াছে। শিশুবয়েসের লঘু জীবন বড়ো বড়ো মৃত্যুকেও অনায়াসেই পাশ কাটাইয়া ছুটিয়া যায়– কিন্তু অধিক বয়সে মৃত্যুকে অত সহজে ফাঁকি দিয়া এড়াইয়া চলিবার পথ নাই। তাই সেদিনকার সমস্ত দুঃসহ আঘাত বুক পাতিয়া লইতে হইয়াছিল। জীবনের মধ্যে কোথাও যে কিছুমাত্র ফাঁক আছে, তাহা তখন জানিতাম না; সমস্তই হাসিকান্নায় একেবারে নিরেট করিয়া বোনা। তাহাকে অতিক্রম করিয়া আর কিছুই দেখা যাইত না, তাই তাহাকে একেবারে চরম করিয়াই গ্রহণ করিয়াছিলাম। এমনসময় কোথা হইতে মৃত্যু আসিয়া এই অত্যন্ত প্রত্যক্ষ জীবনটার একটা প্রান্ত যখন এক মুহূর্তের মধ্যে ফাঁক করিয়া দিল, তখন মনটার মধ্যে সে কী ধাঁধাই লাগিয়া গেল। চারি দিকে গাছপালা মাটিজল চন্দ্রসূর্য গ্রহতারা তেমনি নিশ্চিত সত্যেরই মতো বিরাজ করিতেছে, অথচ তাহাদেরই মাঝখানে তাহাদেরই মতো যাহা নিশ্চিত সত্য ছিল– এমন-কি, দেহ প্রাণ হৃদয় মনের সহস্রবিধ স্পর্শের দ্বারা যাহাকে তাহাদের সকলের চেয়েই বেশি সত্য করিয়াই অনুভব করিতাম সেই নিকটের মানুষ যখন এত সহজে এক নিমিষে স্বপ্নের মতো মিলাইয়া গেল তখন সমস্ত জগতের দিকে চাহিয়া মনে হইতে লাগিল, এ কী অদ্ভুত আত্মখণ্ডন! যাহা আছে এবং যাহা রহিল না, এই উভয়ের মধ্যে কোনোমতে মিল করিব কেমন করিয়া!…জীবনের এই রন্ধ্রটির ভিতর দিয়া যে একটা অতলস্পর্শ অন্ধকার প্রকাশিত হইয়া পড়িল, তাহাই আমাকে দিনরাত্রি আকর্ষণ করিতে লাগিল। আমি ঘুরিয়া ফিরিয়া কেবল সেইখানে আসিয়া দাঁড়াই, সেই অন্ধকারের দিকেই তাকাই এবং খুঁজিতে থাকি-…সেই সময়ে আবার কিছুকালের জন্য আমার একটা সৃষ্টিছাড়া রকমের মনের ভাব ও বাহিরের আচরণ দেখা দিয়াছিল। সংসারের লোকলৌকিকতাকে নিরতিশয় সত্য পদার্থের মতো মনে করিয়া তাহাকে সদাসর্বদা মানিয়া চলিতে আমার হাসি পাইত। সে-সমস্ত যেন আমার গায়েই ঠেকিত না। কে আমাকে কী মনে করিবে, কিছুদিন এ-দায় আমার মনে একেবারেই ছিল না। ধুতির উপর গায়ে কেবল একটা মোটা চাদর এবং পায়ে একজোড়া চটি পরিয়া কতদিন থ্যাকারের বাড়িতে বই কিনিতে গিয়াছি। আহারের ব্যবস্থাটাও অনেক অংশে খাপছাড়া ছিল। কিছুকাল ধরিয়া আমার শয়ন ছিল বৃষ্টি বাদল শীতেও তেতলায় বাহিরের বারান্দায়; সেখানে আকাশের তারার সঙ্গে আমার চোখাচোখি হইতে পারিত এবং ভোরের আলোর সঙ্গে আমার সাক্ষাতের বিলম্ব হইত না।…”। এখানে মনে রাখতে হবে রবীন্দ্রনাথ তখন কিন্তু সদ্য বিবাহিত যুবক, কিন্তু তবু তাঁর মত স্থিতধী মানুষও তখন শোকে এইরকম “সৃষ্টিছাড়া আচরণ “ করছেন, বার বার ছুটে যাচ্ছেন তিনতলার বারান্দায়, শয়নও করছেন, ঘরের মধ্যে নয়, কাদম্বরী দেবীর স্মৃতি মাখা বাইরের সেই বারান্দাতেই।( তাঁর নিজেরই স্বীকারোক্তিতে )।

পরবর্তী জীবনে রবীন্দ্রনাথের লেখায় বার বার ফিরে এসেছেন তাঁর নতুন বৌঠান । শেষ করছি এমনই একটি লেখা দিয়ে —- “বনের ছায়াতে যে পথটি ছিল সে আজ ঘাসে ঢাকা।

সেই নির্জনে হঠাৎ পিছন থেকে কে বলে উঠল, ‘আমাকে চিনতে পার না?’

আমি ফিরে তার মুখের দিকে তাকালেম। বললেম, ‘মনে পড়ছে, কিন্তু ঠিক নাম করতে পারছি নে।’

সে বললে, ‘আমি তোমার সেই অনেক কালের, সেই পঁচিশ বছর বয়সের শোক।’

তার চোখের কোণে একটু ছল্‌ছলে আভা দেখা দিলে, যেন দিঘির জলে চাঁদের রেখা।

অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেম। বললেম, ‘সেদিন তোমাকে শ্রাবণের মেঘের মতো কালো দেখেছি, আজ যে দেখি আশ্বিনের সোনার প্রতিমা। সেদিনকার সব চোখের জল কি হারিয়ে ফেলেছ।’

কোনো কথাটি না বলে সে একটু হাসলে; বুঝলেম, সবটুকু রয়ে গেছে ঐ হাসিতে। বর্ষার মেঘ শরতে শিউলিফুলের হাসি শিখে নিয়েছে।

আমি জিজ্ঞাসা করলেম, ‘আমার সেই পঁচিশ বছরের যৌবনকে কি আজও তোমার কাছে রেখে দিয়েছ।’

সে বললে, ‘এই দেখো-না আমার গলার হার।’

দেখলেম, সেদিনকার বসন্তের মালার একটি পাপড়িও খসে নি।

আমি বললেম, ‘আমার আর তো সব জীর্ণ হয়ে গেল, কিন্তু তোমার গলায় আমার সেই পঁচিশ বছরের যৌবন আজও তো ম্লান হয় নি।’

আস্তে আস্তে সেই মালাটি নিয়ে সে আমার গলায় পরিয়ে দিলে। বললে, ‘মনে আছে? সেদিন বলেছিলে, তুমি সান্ত্বনা চাও না, তুমি শোককেই চাও।”

লজ্জিত হয়ে বললেম, ‘বলেছিলেম। কিন্তু, তার পরে অনেক দিন হয়ে গেল, তার পরে কখন ভুলে গেলেম।’

সে বললে, ‘যে অর্ন্তযামীর বর, তিনি তো ভোলেন নি। আমি সেই অবধি ছায়াতলে গোপনে বসে আছি। আমাকে বরণ করে নাও।’

আমি তার হাতখানি আমার হাতে তুলে নিয়ে বললেম, ‘এ কী তোমার অপরূপ মূর্তি।’

সে বললে, ‘যা ছিল শোক, আজ তাই হয়েছে শান্তি।’

সুএ: নেট থেকে

কবির নাম জানা নেই তাই দেয়া গেল না

https://www.facebook.com/groups/rntfc/

Leave a Reply