রবীন্দ্র জীবনে মৃত্যু : পর্ব ৬ (হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুর) (১৮৮৪)

কাদম্বরী দেবী চলে গেলেন ১৮৮৪র এপ্রিলে। তার পর দুমাসও হয়নি – তার মঝেই জুন মাসে আবার মৃত্যুর শমন জোড়াসাঁকো বাড়ীতে । এবারে ডাক পড়লো – হেমেন্দ্রনাথের। রবীন্দ্রনাথের সেজদাদা, দেবেন্দ্রনাথের তৃতীয় পুত্র তিনি।
হেমেন্দ্রনাথ ছিলেন ঠাকুরবাড়ির এক ডাকাবুকো সদস্য । রবীন্দ্রনাথের চাইতে সতের বছরের বড়, জন্মেছিলেন ১৮৪৪ সালে। একদিকে তিনি যেমন ছিলেন পিতা দেবেন্দ্রনাথের ব্রাহ্ম সমাজের একজন উৎসাহী সদস্য আর এ বিষয়ে তাঁর বিশ্বস্ত অনুগামী, তেমনই অন্যদিকে কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন ঠাকুর বাড়ীর অন্য সদস্যদের শিক্ষাদানের ভার। তিনি নিজে মেডিক্যাল কলেজে পড়েছিলেন, উৎসাহী ছিলেন বিজ্ঞান চর্চায়, জানতেন ইংরিজি ছাড়াও আরও কিছু বিদেশী ভাষা । কিন্তু নিজের শিক্ষার দিকে বেশী মন না দিয়ে তিনি ব্যস্ত হয়ে পড়লেন বাড়ীর অন্যদের পড়াশোনা নিয়ে। তাই একদিকে যেমন নিজের স্ত্রী নীপময়ীকে করে তুললেন শিক্ষায় আর গানবাজনায় দক্ষ, তেমনই তাঁর অন্যান্য ভাইবোনদেরও নানা ভাবে নানা শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে ব্রতী হয়ে পড়লেন। আর শুধু ভাই বোনেরাই নয় – এই দলে তিনি টেনে নিলেন বাড়ির বউদেরও! অচিরেই হয়ে উঠলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, সোমেন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ, ভাগ্নে সত্যপ্রসাদ, স্বর্ণকুমারী দেবী, সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী জ্ঞানদানন্দিনীর গৃহশিক্ষক। দরকার হলে পড়ানোর সময় তাদের ধমক দিতেও তিনি কুণ্ঠিত হতেন না। তাঁর ভয়ে সিঁটিয়ে থাকতেন ঠাকুরবাড়ির পড়ুয়ারা। জ্ঞানদানন্দিনী দেবী ‘পুরাতনী-তে লিখেছিলেন, ‘বিয়ের পর আমার সেজ দেওর হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুর ইচ্ছে করে আমাদের পড়াতেন। তাঁর শেখাবার দিকে খুব ঝোঁক ছিল। আমরা মাথায় কাপড় দিয়ে তাঁর কাছে বসতুম আর এক একবার ধমক দিলে চমকে উঠতুম।’ রবীন্দ্রনাথও লিখেছেন – “সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পড়াশুনোর জাঁতাকল চলছেই। ঘর্ঘর শব্দে এই কলে দম দেওয়ার কাজ ছিল আমার সেজদাদা হেমেন্দ্রনাথের হাতে। তিনি ছিলেন কড়া শাসনকর্তা।“ আবার ইংরেজি ও ফরাসি ভাষার প্রতি প্রবল প্রেম থাকলেও শুধু ইংরেজি শিক্ষার প্লাবনে তাঁর ছাত্রছাত্রীরা ভেসে যাক, এ ইচ্ছে ছিল না হেমেন্দ্রনাথের।তাই জোর দিতেন বাংলা ভাষার ওপরেও । রবীন্দ্রনাথ পরে লিখেছেন, ” সেজদাদা বলতেন আগে চাই বাংলা ভাষার গাঁথুনি, তার পরে ইংরেজি শেখার পত্তন।” আবার এই ধরনের বিদ্যাচর্চা ছাড়াও সঙ্গীত চর্চাও ছিল তাঁর অন্যতম প্রিয় বিষয় । এখানেও রবীন্দ্রনাথের লেখায় আমরা পাই – “ সেজদাদা শিখতেন বটে– তিনি সুর ভাঁজছেন তো ভাঁজছেনই, গলা সাধছেন তো সাধছেনই, সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত।“ এই আগ্রহ থেকেই তিনি উৎসাহী হয়েছিলেন স্ত্রী নীপময়ীর সঙ্গীত শিক্ষায়। এগারো জন সন্তান সন্ততি ছিল তাঁর, তাদেরও প্রত্যেকের জন্যে যথাযথ আধুনিক শিক্ষার ব্যবস্থা তিনি করেছিলেন । আবার অবাক হতে হয়, সঙ্গীত, বিদ্যাচর্চার পাশাপাশি তিনি ছিলেন শরীর চর্চা আর কুস্তিতেও পারদর্শী । নিয়মিত কুস্তি লড়তেন, সুঠাম শরীর ছিল তাঁর। মা সারদা দেবীর গুরুতর অসুস্থতার সময় তাঁর হাতে অস্ত্রোপচার করতে হয়েছিল। এই অস্ত্রোপচারে গ্রাফটিং-এর প্রয়োজন পড়েছিল। হেমেন্দ্রই সেই সময় বাহুমূল থেকে মাংসখণ্ড কেটে সাহায্য করেছিলেন মায়ের অপারেশনে -শরীর তাঁর এমনই মজবুত ছিল। সেই সময়ের নিরিখে এটি ছিল জটিল আর আধুনিক চিকিৎসা। তবু এই প্রাণবন্ত মানুষটিও একদিন অকালে চলে গেলেন – মাত্র চল্লিশ বছর বয়েসে, ১৮৮৪ সালের ৫ই জুন । ( এটি প্রভাত মুখোপাধ্যায়ের অভিমত – কিন্তু বিভিন্ন স্থানে তাঁর মৃত্যুর বিভিন্ন তারিখের উল্লেখ আমরা পাই, যদিও মৃত্যুর বছরটি সব জায়গাতেই এক – ১৮৮৪ ) এমন একজন মজবুত লোক মাত্র চল্লিশেই ফুরিয়ে গেলেন কেন? ঠিক উত্তর পাওয়া যায়নি। জ্ঞানদানন্দিনী ‘পুরাতনী’-তে জানাচ্ছেন, ‘সেজঠাকুরপোই বেশি কুস্তি করতেন। বোধহয় ছেড়ে দেবার পর যে বাতে ধরল তাতেই অপেক্ষাকৃত অল্প বয়সে তিনি মারা গেলেন।’ তাঁর মৃত্যু নিয়ে রবীন্দ্রনাথের বিশেষ লেখা পাওয়া যায়নি। শুধু একজায়গায় তিনি লিখেছেন – ‘যখন চারিদিক খুব করিয়া ইংরেজি পড়াইবার ধুম পড়িয়া গিয়াছে, তখন যিনি সাহস করিয়া আমাদিগকে দীর্ঘকাল বাংলা শিখাইবার ব্যবস্থা করিয়াছিলেন, সেই আমার স্বর্গত সেজদাদার উদ্দেশে সকৃতজ্ঞ প্রণাম নিবেদন করিতেছি।

সুএ: নেট থেকে

কবির নাম জানা নেই তাই দেয়া গেল না

https://www.facebook.com/groups/rntfc/

Leave a Reply