রবীন্দ্র জীবনে মৃত্যু : পর্ব ৭ (অভিজ্ঞা দেবী) (১৮৯৬)

এর আগের পর্বেই হেমেন্দ্রনাথের কথা বলেছি। আজকের পর্বে বলতে হচ্ছে তাঁরই কন্যা অভিজ্ঞার কথা।

হেমেন্দ্রনাথের ছিল এগারোটি সন্তানসন্ততি, তার মধ্যে অভিজ্ঞা ছিলেন তাঁর ষষ্ঠ সন্তান এবং তৃতীয়া কন্যা। এই অভিজ্ঞার সবচাইতে বড় ছিল তাঁর কণ্ঠ সম্পদ। এ ছাড়াও তাঁর চেহারার মধ্যে ছিল এক শান্ত, গম্ভীর, রোদনভরা বিষাদ । সবার চোখ টানত তাঁর মাধুর্য পূর্ণ দুটি বড় বড় জীবন্ত চোখ । তিনি চলে গিয়েছিলেন, ১৮৯৬ সালে, মাত্র বাইশ বছর বয়সে ( জন্ম – ১৩ই জানুয়ারি, ১৮৭৪ ), তাই অনেকেই তাঁকে দেখেননি। কিন্তু যারা দেখেছিলেন, তাঁরা আবার ভোলেন নি । তাই অনেকের স্মৃতিতেই অভিজ্ঞা পরে বার বার ফিরে এসেছেন। তিনি ছিলেন রবীন্দ্রনাথেরও আদরের ভাইঝি অভি। তাঁর গলায় নিজের গান শুনে মুগ্ধ হয়ে যেতেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। তাঁর প্রথম জীবনের গানগুলি অভিজ্ঞার কণ্ঠে যেন জীবন্ত রূপ পরিগ্রহণ করত। একদিকে যখন রবীন্দ্রনাথ সৃষ্টি করে চলেছেন বাল্মীকিপ্রতিভা, কালমৃগয়া, মায়ার খেলা – তখন অন্যদিকে ক্লান্তিহীন কণ্ঠে তাকে রূপ দিয়ে চলেছেন অভিজ্ঞা । ১৮৮২ সালে অভিনীত হল কালমৃগয়া, ন বছরের অভিজ্ঞা নিলেন লীলার ভূমিকা । এই অভিনয়ে রবীন্দ্রনাথ সেজেছিলেন অন্ধমুনি, আর জ্যোতিরিন্দ্রনাথ দশরথ। কিন্তু ছোট্ট অভিজ্ঞার অভিনয় সবার মনে যতটা দাগ কেটেছিল, তার কাকারাও সেদিন তেমন পারেন নি । তার গান শুনে অনেকেই সেদিন চোখের জল রাখতে পারেননি, কাগজে লেখা হয়েছিল “ লীলার গান শুনলে পাষাণ হৃদয়ও বিগলিত হয়”। এই “ পাষাণ গলানো গান “ আবার শোনা গেল বাল্মীকি প্রতিভায়, যেখানে হাত বাঁধা বালিকার গানে তিনি সবার মন এক নিমেষে জয় করে নিলেন। এরপর এল “ মায়ার খেলা “। তার গানকে আরো জীবন্ত করে তুলল অভিজ্ঞার অসাধারণ মাধুরী মেশানো কণ্ঠ। অভিজ্ঞা একাসনে বসে বাল্মীকি প্রতিভা বা মায়ার খেলার সব গান গাইতে পারতেন। তাঁর সেই অসাধারণ মর্মস্পর্শী গানের কথা স্মরণ করে অবন ঠাকুর বহুদিন পরে বলেছেন – “ হায়, যে ওসব গান গাইবে, সে মরে গেছে। সেই পাখির মত আমাদের ছোট বোনটি চলে গেছে। … সে সুরে যে গাইত সে মরে গেছে “ ।

আসলে অভিজ্ঞার মৃত্যু তখন অনেকের মধ্যেই একটা হাহাকার নিয়ে এসেছিল, আর তার কারণও ছিল । তার বিয়ে হয়েছিল দেবেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে – পেশায় তিনি ছিলেন ডাক্তার। কিন্তু বিয়ের রাতেই ঘটেছিল অঘটন। বিয়ের অনুষ্ঠানের শেষেই অভিজ্ঞা অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন হঠাৎ আসা প্রবল জ্বরে। দিনে দিনে সে অসুখ বেড়েই চলল, জানা গেল দুরারোগ্য ক্ষয় রোগ কখন যে তলে তলে তাঁকে গ্রাস করে ফেলেছে, তা আগে থেকে কিছুই বোঝা যায়নি। আর তিনি সুস্থ হলেন না, বিয়ের মাত্র একমাসের মধ্যেই নববিবাহিতা অভিজ্ঞার মৃত্যু ঘটল জোড়াসাঁকোর বাড়ীতেই, তাঁর চিকিৎসক স্বামী তাঁকে আরোগ্য করার সুযোগই পেলেন না।

এই যে এইভাবে অভিজ্ঞার অকালে চলে যাওয়া, এতে সবচাইতে ক্ষতি হয়েছে কিন্তু রবীন্দ্রসঙ্গীতেরই । কারণ, তাঁর সেই প্রথম সৃষ্টির যুগে অভিজ্ঞার মত প্রতিভাময়ী গায়িকা বেঁচে থাকলে রবীন্দ্রনাথ হয়তো প্রয়োগের দিক থেকেও আরো নতুন কিছু ভাবতে পারতেন। প্রমথ চৌধুরী যার সম্পর্কে বলেছিলেন – “ জীবনে কোন কোন লোক প্রথম থেকেই আমাদের মনে বিশেষ ছাপ রেখে যায়, যা কখনো বিলুপ্ত হয় না । অভি ছিল সেই দু চারটি লোকের ভিতরে একজন। ইংরেজরা বলে – “ Whom the God loves die young. অভি ছিল সেই দেবানাং প্রিয় একটি বালিকা “,সেই অভির এ হেন অকালমৃত্যু রবীন্দ্রনাথকেও গভীর ভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল স্বাভাবিকভাবেই। তাই পরে বারে বারে টুকরো ভাবে তাঁর কথায় বা লেখায় এসেছে অভির প্রসঙ্গ। সোনার তরীর বিম্ববতী কবিতার পিছনে অভির যে একটা ছোট্ট ভুমিকা ছিল, তাই নিয়ে এক জায়গায় লিখেছেন – “ একদিন কি একটা কারণে, আমার খুব রাগ হয়েছিল। অভি এসে আমার চৌকির পিছনে দাঁড়িয়ে চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে, ঠিক সেই সময়ে যা তা বকে গেল, এক মুহূর্তে আমার সমস্ত রাগ জুড়িয়ে জল হয়ে গেল ।…তারই মুখে রূপকথার গল্প শুনে আমি সোনার তরীতে বিম্ববতীর গল্প লিখেছিলাম।“ আবার অভিজ্ঞার মৃত্যুর পর তিনি চারটি সনেট ধর্মী লেখা লিখেছিলেন – নদীযাত্রা, মৃত্যুমাধুরী, স্মৃতি আর বিলয়। কোথাও যেন এগুলির মধ্যে অভির ছায়া আছে ।স্মৃতি কবিতায় আমরা দেখতে পাই –

“সে ছিল আরেক দিন এই তরী-‘পরে,
কন্ঠ তার পূর্ণ ছিল সুধাগীতিস্বরে।
ছিল তার আঁখি দুটি ঘনপক্ষ্ণচ্ছায়,
সজল মেঘের মতো ভরা করুণায়।
কোমল হৃদয়খানি উদ্‌বেলিত সুখে,
উচ্ছ্বসি উঠিত হাসি সরল কৌতুকে।
পাশে বসি ব’লে যেত কলকণ্ঠকথা,
কত কী কাহিনী তার কত আকুলতা!
প্রত্যুষে আনন্দভরে হাসিয়া হাসিয়া
প্রভাত-পাখির মতো জাগাত আসিয়া।
স্নেহের দৌরাত্ম্য তার নির্ঝরের প্রায়
আমারে ফেলিত ঘেরি বিচিত্র লীলায়।
আজি সে অনন্ত বিশ্বে আছে কোন্‌খানে
তাই ভাবিতেছি বসি সজলনয়ানে।

এখানেও সেই সুধাগীতিময় কণ্ঠ আর ঘনপক্ষ্ণচ্ছায় আঁখির উল্লেখ, যে চোখের কথা আমি আগেই বলেছি। আবার শিলাইদহ থেকেও একটি চিঠিতে ইন্দিরাকে লিখেছেন – “ তোর আজকের চিঠির মধ্যে অভির গানের একটু উল্লেখ আছে। … পড়ে মনটা কেমন হঠাৎ হু হু করে উঠলো, অভির মিষ্টি গান শোনার জন্য আমার এমনি ইচ্ছে করে উঠলো যে তখনি বুঝতে পারলুম , আমার প্রকৃতির অনেকগুলি ক্রন্দনের মধ্যে এও একটা ক্রন্দন ভিতরে ভিতরে চাপা ছিল …” ।

রবীন্দ্রনাথের জীবনে এটিও একটি দুঃসহ মৃত্যু ।


সুএ: নেট থেকে

কবির নাম জানা নেই তাই দেয়া গেল না

https://www.facebook.com/groups/rntfc/