আমার কৈশোরের আর এক টুকরো : Mithu Chaudhari

ভাদ্রের একটানা বৃষ্টির ক্লান্তি কাটিয়ে হঠাৎ একদিন উঁকি দেয় নীল আকাশ। এই জন্যই শরৎ এমন উৎসব। চারদিক টইটম্বুর অথচ ঝলমলে। ভার ঝরিয়ে দেওয়া সাদা মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে হাল্কা পল্কা। কোথাও যাবার তাড়া নেই। ঝাঁকে ঝাঁকে লাল ফড়িং টহল দিচ্ছে এদিক থেকে ওদিক, যেন যুদ্ধজাহাজ! আমি ভোকাট্টা ঘুড়ির মতো টাল খেয়ে ঘুরছি হারা উদ্দেশে। মনের অস্থিরতা টিকতে দিচ্ছে না একদণ্ড। নির্বিঘ্নে যে জগতে এতকাল কাটিয়েছি, সেখানে অজানা উৎপাতের হাওয়া ঢুকে পড়েছে না বলে কয়ে। এবং বেমালুম জোচ্চুরিতে ভুল বোঝাতে লেগেছে।
বন-পৃথিবীর আদর যে রোমাঞ্চ-স্বাদ, রহস্যের স্পর্শ দিয়েছিল, সে স্বপ্নে আর তেমন খোশমেজাজ রইল না। মনে হল এই প্রপঞ্চের উত্তর পেতে গেলে আমাকে বাঁধা রাস্তাতেই যেতে হবে। যে চাওয়ায় মন এমন উতল, সত্যি সত্যি পেলে না জানি সে কত মধুর! জন্ম এস্তক শুনে আসছি মরার বাড়া গাল নেই, আর বিয়ের বাড়া সুখ নেই। ‘সব পথই রোমে যায়’-এর মতো ‘যা-ই কর, বিয়েই শেষ কথা’।

কলোনীর ছোট গণ্ডীর মধ্যে থাকার ফলেই হোক, বা সুখের ফলটি পেড়ে খেলেই সর্ব বাসনা সার্থক হবে এমন ধারণার জন্যই হোক, প্রথা-ছাড়ানো ভাবনাগুলো কখন এসে চলে গেল, মনের ভেতর ঠাঁই পেল না, তার পরোয়াই করলাম না। কোনমতে স্কুলের বেড়া পেরিয়ে কলেজে যা হোক বিষয় নিয়ে ঢুকে পড়লেই হয়, এমন বিশ্বাস থিতু বসত গাড়ল মগজে। এই যৌবন-তরঙ্গ কেবল লাল বেনারসী পরে অচিন কেল্লায় পা রাখার জন্য নয়, এর অন্য উদ্দেশ্য আর শক্তিও যে আছে, এ কথা মাথায় এল না। ঝড় হয়ে দিকভ্রষ্ট করবে, এমন পুঞ্জ মেঘের সঙ্গে আশনাই হল না, শুধু ছিটেফোঁটা বৃষ্টির তাড়সে স্যাঁতসেঁতে উত্তাপে সুখ সেঁকতে শিখলাম।

মাস্তুলহীন এই ভেসে বেড়ানো। দিক জানা নেই। কাণ্ডারী নেই। কেবলই স্বপ্নের বুদবুদ উড়িয়ে দিন পার করা। উড়ো খই ছড়িয়ে, ভষ্মে ঘি ঢেলে পুতুল তৈরির কারিগর বনলাম নিজেই। পোড়ামাটির শক্তপোক্ত মানুষদের সঙ্গতে যে বিদ্রোহের উস্‌কানি ছিল, তা মাঠে মারা গেল না বটে, কিন্তু গভীর ঘুমের দেশে ডুব দিল। জেগে উঠতে বিপুল কাল কেটে গেল। তত দিনে দফা যা ছিল, সবই রফায় বদলে গেছে।

তখনও বাগানের আনাচকানাচ মনকেমনের কিংবা একলা বেলার সঙ্গী, কিন্তু সেখানে মটুকদা নেই আর, এসেছে অন্য মালি। নেহাৎই বাংলার গ্রাম-দেশের। বাগান করা তার চাকরি, ভালবাসার কাজ নয়। সে সংসারী মানুষ। দু’ পয়সা কামানো উদ্দেশ্য। ওর গায়ে মাটি-বিড়ি-ঘাসের গন্ধ নেই। আমার সঙ্গে ভাবও নেই। কোনো গল্পই জানে না, এমনকি কোন্‌ সময়ে কোন্‌ গাছ লাগাবে, তা-ও না। মায়ের সঙ্গে মোটে বনে না এই মালিদাদার।

আমি তাই খানিক একা হয়ে গেছি। এমন একটা সময়ে বাইরের জগতের এক টান-দোটান আমায় অপেক্ষায় রাখতে শুরু করল। অর্থাৎ আবার প্রেমে পড়লাম। তবে এবার আর দূর থেকে নীরব নিবেদন নয়। এক রক্তমাংসের মানুষ আমায় চিঠি লেখে। এক আত্মীয়ের বাড়ির অনুষ্ঠানে তার সঙ্গে আলাপ। সে আমার গান আর আঁখিতে মুগ্ধ। স্পষ্ট করে এসব কথা হয়নি আমাদের মধ্যে। চিঠির লিখন এবং উভয় পক্ষের উত্তরের অধীর অপেক্ষা বিষয়টাকে অস্পষ্টও রাখেনি। সুন্দর ঝরঝরে হাতের লেখা ছেলেটির। সাদা খামে গোটা গোটা অক্ষরে ঠিকানা লেখা। হলদে আর নীল চিঠির দল থেকে সহজেই আলাদা করা যায়।

তখন পুজোর ছুটি চলছে। অতীব তক্কে তক্কে থাকি, পিওনকাকুর হাত থেকে সে চিঠি যেন অন্য হাতে চলে না যায়। বাকি চিঠি বাইরের ঘরের টেবিলে ফেলে রেখে চলে যাই বাগানে। ক্রোটনের নিরালায় সাদা খাম হাতে বসে থাকি কিছুক্ষণ। তক্ষুণি তক্ষুণি খুলি না। আশ্বিন শেষের দুপুর তকতক করছে। রঙ্গন, কুরুশের ঝোপে অজস্র প্রজাপতির আসা-যাওয়া। একটা কালো ভোমরা বোঁও-ও করে উড়ে মিলিয়ে যায় দূরে। টিয়ার দল তীব্র ট্যাঁ ট্যাঁ ডাকে চারদিক সরগরম করে সূর্যমুখীর বনে এসে বসে। ধীরে সুস্থে চিঠি খুলি। বোধহয় ছেলেটির চেয়ে চিঠির ওপরেই আমার ভালবাসা বেশি। ওর লেখা অনেক কথাই বুঝি না। এবং সেটা বেশিরভাগ। সেখানে চাকরির কথা, সিনেমা দেখার খবর, কোন্‌ জায়গা থেক কোথায় বদলি হল তার ঠিকানা…এইসব ইত্যাদি নানাবিধ।

চট করে চোখ বুলিয়ে চলে যাই পরের পর্বে। প্রতি চিঠিতেই ভবিষ্যতের রঙদার ছবি। কি যে সুখের সেই জীবন! সুখই সুখ। দুঃখ নামক বে-আক্কলের রসভঙ্গ করার কোনো ইঙ্গিতই নেই। একটি নিটোল বসত কেবল আমাদের দু’জনের। পাখি ডাকবে, ফুল ফুটবে। বিস্তর প্রেমের আপেল ঝুলবে গাছে গাছে, কিন্তু পেড়ে খাওয়ার পর কি হবে, সে ব্যাপারে কোনো হদিশ থাকে না। ঝুট-ঝামেলাও কিছু থাকে না অতএব।

শেষ দু’ তিন লাইনে লেখা আমার স্তুতি। আমার চোখ হরিণের মতো, শরীর বনটিয়ার, স্বর কোকিলের, আর হৃদয় নরম চকোলেট। ফুল-শর অবাধে বিঁধে ঝুলতে থাকে। পড়তে পড়তে কান গরম হয়, গালে রক্ত ফোটে, চারপাশে সব ঝাপসা। মনে হয় এ রূপকথা সত্যি না হলে জীবনই বৃথা।

চিঠি পড়া শেষ হতে হতে বেলা ঢলে আসে। কোলের ওপর চিঠি মেলে আনমনা তাকিয়ে থাকি বুড়ো নিমের দিকে। পাতাগুলো সামান্য বিবর্ণ। ঝরে যাওয়ার সময় হয়ে এল। শেষবেলায় পাখপাখালি ডালে বসে গা পরিষ্কার, বাসার তদারকি, গল্পগাছা সেরে নিচ্ছে। সামনে রাত। অজানা, অন্ধকার। কে যে প্যাঁচার শিকার হবে, কার ছানারা সাপের পেটে যাবে কেউ জানে না। হঠাৎ ঝড় এসে আলাদা করে দিতে পারে ঠোঁটে ঠোঁট রাখা দুই পায়রাকে। আমার গা ছমছম করে। ভয়ের শীত বেয়ে ওঠে শিরদাঁড়ায়। একটা ভুল ঠিকানার সামনে দাঁড়িয়ে আছি, অথচ এমন তার সম্মোহন, আধ-খোলা দরজার দিকেই তবু পা চলে যায়। আমি চাই গাছ-আকাশ-জল-প্রান্তর বুকে করে আগলে রাখুক। আবার এ-ও চাই যে পুরুষের বলিষ্ঠ দু’ হাত আমায় ঘিরে রাখুক প্রেমে-পুলকে। আসলে কি চাই তা যে বিলকুল জানি না, এ তারই সাবুদ।

এবারের প্রেম কতদূর গড়াত কে জানে! তবে গড়াল না বেশি। সাক্ষাৎ পেয়াদা হয়ে এল ভাই। বমাল সমেত ধরা পড়লাম। সে বত্রিশ পাটি বার করে মায়ের কাছে চিঠি পেশ করল। কোথা দিয়ে কি ঘটল জানতে পারলাম না, চিঠি আসা বন্ধ হয়ে গেল। ঠারে-ঠোরে আমাকে শোনানো হল এসব খুব খারাপ কাজ, ভাগ্য ভাল, তাই অনিবার্য সর্বনাশ এড়ানো গেছে।

কষ্ট তো হলই। ষোল বছর বয়সে সেই উপড়ে ফেলা চারাগাছের যন্ত্রণা কম নয়। ক’দিন খেলাম না ভাল করে। ক’ রাত ভোর হওয়া পর্যন্ত ছটফট করলাম বিছানায়। চোখের জলে বালিশ ভেজালাম।

ষোল বছর বলেই বোধহয় এক সকালে রোদ্দুর বড় মিঠে মনে হয়। সদ্য শীতের আমেজ পাকাহ ফড়ফড় করা চড়ুইয়ের মতো অকারণ খুশি নিয়ে আসে। সকালের বাগানে কপি চারায় হীরে-দানা শিশিরের ফোঁটা। পুকুরপাড়ে একটা খঞ্জনা লেজ নাচিয়ে ঘুরছে। ও এসেছে দূর থেকে। পরিযায়ী পাখি। তার মানে শীত এসে গেল। আমি উমুর-ঝুমুর চুল উড়িয়ে ছুটতে থাকি দুই ঝিলের মাঝের রাস্তা দিয়ে। পেছনে পেছনে আমার কুকুর চিন। এক ঝাঁক বালি হাঁস ঝটফট করে ত্রস্ত ওড়ে আকাশে।

হঠাৎ বুঝতে পারি আসলে আমি এটাই চাই। নির্দ্বিধায় খোলা-মেলা এই ছুটে যাওয়াই আমাত আত্মার উজ্জীবন। আমার মুক্তির আনন্দ।