আরও একবার মতামতের অপেক্ষায় : Mithu Chaudhuri

আমাদের বাগানে মালির কাজ করে মটুকদা। বছর পঞ্চাশের বেঁটেখাটো পোক্ত চেহারার সাঁওতাল। পরনে হাঁটু পর্যন্ত ধুতি, খাকি রঙের ফতুয়া, মাথায় গামছা বাঁধা। সকাল হলেই দূর থেকে দেখা যায় কারখানার পাশের রাস্তা ধরে হেঁটে আসছে। ওদিকেই সাঁওতাল গ্রাম। মটুকদার হাতে থাকে দু’ বাটির টিফিনকারি। গেট দিয়ে বাগানে ঢুকে করবী গাছের ডালে জামা টাঙিয়ে রাখে। তারপর গ্লাস ভরা চা আর একটা বিড়ি খেয়ে কাজে লেগে পড়ে। সারাদিন ঘাস ছেঁটে, মাটি খুঁড়ে, বীজ পুঁতে, চারা লাগিয়ে, কলম করে, টবের মাটি পালটে যত্ন করে বাগানের। মাঝে মাঝে মা এসে তদারকি করে। কোন্‌ চারা কোথায় লাগালে ভালো হবে, কুমড়ো লতা মাচায় তোলার সময় হয়েছে কি না, পেঁয়াজ চারা আর আলুর বীজ আনতে কবে হাটে যাবে মটুকদা, এইসব আলোচনা চলে দু’জনে।

মটুকদার সঙ্গে আমিও অনেক গল্প করি। কিন্তু বাগানের নয়। কারখানায় বারোটার ভোঁ বাজলে মটুকদা টিফিনকারি খুলে খেতে বসে। বাড়িতে থাকলে আমিও গিয়ে বসি কাছে। ওর খাওয়া দেখতে ভালো লাগে। একটা বাটিতে জলঢালা ভাত, অন্যটায় শাক-চ্চচড়ি। আর কিছু নয়। কিন্তু এমন তৃপ্তি করে খায়, যেন মাংস পোলাও।
আমারও ইচ্ছে করে ওরকম করে খেতে। খাওয়ার সময় টেবিলে না বসে ভাতের থালা নিয়ে রান্নাঘরে উবু হয়ে বসি। নিজের মনে কথা বলি।

মটুকদা ভাতে নুন মেখে গ্রাস তোলে। একটুখানি তরকারি থেকে এক চিমটে নিয়ে মুখে দেয়। একবার মটুকদার হাতের দিকে তাকাই, একবার মুখের দিকে। আর বকবক করি সমানে।
… ও মটুকদা, সেই গল্পটা বল না আবার!
…কুনটো দিদি? আমাদের গাঁয়ের?
… হুঁ, তোমাদের গ্রামের, আর পরবের, আর সেই যে ফণা তোলা কালো সাপ দেখেছিলে, সব, স-ব।
মটুকদা নিম দাঁতন করা ঝকঝকে সাদা দাঁত মেলে হাসে। টপ্‌ করে দুটো ভাতের দানা পড়ে ধুতিতে। আমি উৎসুক হয়ে অপেক্ষা করি গল্প শুনব বলে। বেচারিকে খাওয়ার সময় বিরক্ত করছি সে কথা মনে থাকে না। মটুকদা বিরক্ত হয় না। একই গল্প অনেকবার বলতে হলেও না।
…গাঁ আর কুন্‌খানে রইল দিদি! সে ছিল তখুন এই সারা রাইজ্য জুড়ে। হেই এপার থেকে হুই পার। মাঠ, পুখর, লদী সব লিয়ে। এখুন তো ইদিকে টুকরা, উদিকে টুকরা। সাঁন্‌তালরাও তেমুন রইল না গো!
… এই বাগান, মাঠ, ঝিল সব তোমাদের ছিল?
… হঁ।
… ওই কারখানার জায়গা? ওই বড় মাঠ? সব?
… হঁ দিদি।
… তোমরা দিয়ে দিলে কেন?
… লিয়ে লিলো দিদি। কারখানা বইন্‌বেক, জমি লাইগ্‌বেক্‌ নাই?
… বিক্কিরি করে দিয়েছ তোমরা?
… মু উসব জানি নাই। উ মোড়লরা জানে।
আমিও জানি না কিছু। কিন্তু কৌতূহল হয়।
মটুকদা খাওয়া শেষ করে হাত চাটে। জিজ্ঞেস করি:
… তোমাদের রাজা ছিল? আর রাজকন্যা?
… সেটো কি বেঠে?
… মেয়ে। রাজার মেয়ে।
… হঁ, ছিল। রাজা থাইক্‌বেক্‌, তো ব্যাটা বিটিও থাইক্‌বেক্‌।
… কোথায় থাকত গো ওরা? কি খেত?
… আমাদিগের যেমুন ঘর, ওমনই ছিল। ভাত খেইঁত, মহুয়া খেইঁত, আর লাইচ্‌ত।
… রাজা নাচত?
… হঁ দিদি। পরব হলে লাইচ্‌বেক লাই? মাদল বাইজ্‌বেক্‌, বাঁশিঁ বাইজ্‌বেক্‌, তবে লয় পরব!
… মটুকদা…
… ইবার কাজে লাইগ্‌তে হবেক্‌ দিদি। ভোঁ বাইজ্‌ল শুনো নাই? যাও, খেঁইয়ে লাও। মা ইবার রাইগ্‌বেক্‌।
… গল্প শেষ হল না তো!
… হবেক্‌। ফিরে বইল্‌ব কাল। বেলা হই যেঁইন্‌ছে। খাওগা যাও।

বুঝতে পারি মটুকদা আজ আর কিছুতেই গল্প বলবে না। এখন ওকে আলু গাছের লাইনের মাঝে মাঝে আল বানাতে হবে সেচ দেওয়ার জন্য। ও বিড়ি ধরিয়ে মাথায় গামছা বেঁধে কাজে লেগে যায় আবার। দুপুর বেশ লায়েক হয়েছে। ভেতর থেকে মা ডাকছে শুনতে পাচ্ছি। বকুনির ভয়ে কোনোমতে নাকে মুখে গুঁজে ঘুরঘুর করি এদিক-ওদিক। খাওয়া শেষ করে, হেঁসেল গুছিয়ে ক্লান্ত মা চুল এলিয়ে শোয় খাটে। দুপুরে একটা বই হাতে নিয়ে শোওয়া মায়ের অভ্যেস। হয় নবকল্লোল, নয় উলটোরথ। ওগুলো না কি বড়দের বই। পড়া হয়ে গেলে লুকিয়ে রাখে তোশকের তলায়, কিংবা আলমারির জামাকাপড়ের নিচে।

আমাদের দৌরাত্ম্যে অনেক কিছুই লুকিয়ে রাখতে হয়। বিকেলের জলখাবারের জন্য মা প্রায়ই ভালমন্দ খাবার বানায়। ঘুগনি, চিঁড়ের পোলাও, পরোটার সঙ্গে খাবার জম্পেশ আলুর দম। বিকেল পর্যন্ত সেগুলো টিকে থাকবে কি না, সেই ভয়ে অসম্ভব অসম্ভব জায়গায় লুকিয়ে রাখে। কিন্তু আমাদের কুকুরের নাক। আমার আর ভাইয়ের। দিদি লক্ষ্মী। খেতে দিলে তবেই খায়। আমরা দু’জন গন্ধ শুঁকে শুঁকে ঠিক বার করি। দুপুরে মা ঘুমিয়ে পড়লে অর্ধেক সাবাড় করে দিই।

আমার সবসময়েই খিদে পায়। গল্পের বই পড়ার খিদেও। সুযোগ পেলেই নবকল্লোল, উলটোরথ পড়ে আবার যেমনকার তেমন রেখে দিই। মা ধরতে পারলে বকুনি জোটে। তবে সে তুচ্ছ, কে আর পরোয়া করে!
মা কোনদিনই তিন-চার পাতার বেশি পড়তে পারে না। ভোর থেকে খাটাখাটনি চলে, শুলেই ঘুম এসে যায়, আলগা হাত থেকে খসে পড়ে বই। ঘণ্টা দু’য়েক গভীর ঘুম এখন। পা টিপে টিপে পেছনের দরজা দিয়ে আমি ধাঁ।

মটুকদা তখন চন্দ্রমল্লিকার ডাল কেটে কেটে বালিতে পুঁতছে। ওগুলোতে শেকড় গজালে সারি দিয়ে লাগাবে সামনের বাগানে। পাশে বসে চুপ করে ওর কাজ দেখি খানিকক্ষণ। বালি ঘাঁটি, খুরপি দিয়ে মাটি খুঁড়ি, ঝারিতে জল নিয়ে মিছিমিছি ঝর্না বানাই।

বাগানের পশ্চিম দিকে পানের আকারের একটা চৌবাচ্চা আছে। বেশ গভীর। ছোট ছোট সাদা কুমুদ ফুল ফোটে জলে। শামুক আর কুচো চিংড়ির দল শ্যাওলা ধরা দেওয়াল আঁকড়ে থাকে। ব্যাঙেরা পাড়ে বসে রোদ পোহায়। মানুষের সাড়া পেলে টুপ করে লাফ দেয় জলে। তেলাপিয়া মাছেরা বুড়ো হয় চৌবাচ্চায়। কেউ ধরে না। অনেকদিন থাকতে থাকতে ওদের শরীরে রামধনুর রঙ। রোদ্দুরের ফলায় ঝকঝক করে। হাতে ভাত নিয়ে জলে ডোবালে ছুটে আসে ঝাঁক বেঁধে।
চৌবাচ্চার ধারে অনেক নিঝুম দুপুর কাটে। জলের মধ্যে নিজের ছায়া দুলে দুলে ভেঙে যায়। অজানা রহস্যের ছায়া হাতছানি দিয়ে ডাকে। আনমনা হয়ে তাকিয়ে থাকি কালো জলের নিচে। দূর থেকে বসন্তবৌরির কুক্‌ কুক্‌ ডাক একটানা ভেসে আসে। শোনা যায় সামনের মাঠে চরে বেড়ানো গরুর গম্ভীর ডাক…হা-ম্বা-আ। ভেড়া আর ছাগলের দল ব্যা ব্যা, ম্যা ম্যা করে ওঠে। কে জানে কোথা থেকে ঘুরে ফিরে জিভ বার করে হাঁফাতে হাঁফাতে জনি এসে বসে বারান্দায়।

আমি ছাগল ভেড়ার ডাক খুব ভালো নকল করতে পারি। ঘাস-পাতা চিবোতে চিবোতে হয়তো একটা ছাগল চলে এসেছে বেড়ার কাছে, ওমনি বোগেনভিলিয়া ঝোপের আড়াল থেকে ডাকি
… ম্যা-ম্যা। ম্যা…
চমকে ওঠে ছাগলটা। ল্যাটপ্যাটে ঝোলা কান নাড়িয়ে তাকায়। মোটা কালো নাকে ঘামের ফোঁটা। মুখ থেকে আধ-খাওয়া ঘাসের ডাঁটি ঝুলছে। ওমনি থমকেই দাঁড়িয়ে থাকে খানিক। চোখে অবাক দৃষ্টি। স্বজাতীয় চেহারা দেখতে না পেয়ে আবার মুখ নামিয়ে ঘাস চিবোতে শুরু করে। আবার মিহি স্বরে ম্যা-হ্যা ডেকে উঠি। আবার থতমত খায় বোকা ছাগল।

খেলা শেষ করে গেটের সামনে এসে দাঁড়াই। সুনসান দুপুর। দূরের মাঠ যেন তেপান্তর। ওই ওপাশে মাঠ পার হয়ে সাঁওতাল গ্রাম। বড় ঝিলের জলে রোদ হেলে পড়েছে। এত বেলাতেও চান করছে কেউ। দূর থেকে কালো মাথা দেখা যাচ্ছে। ঝিলে বড় বড় মাছ। ঘপাৎ করে ঘাই মারলে উথলে ওঠে জল। মাথায় গামছা ঢেকে ছিপ হাতে সারাদিন পাড়ে বসে থাকে অনেকে। বছরে একবার কি দু’বার কোম্পানির তরফ থেকে জেলেদের দিয়ে মাছ ধরিয়ে কম দামে বিক্রি করা হয়। তখন ভিড়ে ভিড়াকার হয়ে থাকে ঝিলের পাড়।

এমনিতে ঝিম ধরা দুপুরে বুড়ো পাকুড়ের মাথা ঝুলে থাকে জলে। একটু ছড়িয়ে ছিটিয়ে শাল, মহুয়া। ঝিলের অন্য পাড়ের ঢালুতে শিবমন্দির। এতদূর থেকেও সাদা চূড়া দেখা যায়। সামনের মাঠে সাঁওতাল ছেলেমেয়েরা গরু, ভেড়া, ছাগল চরায় সারাদিন। কোনো ছেলে গরুর পিঠে শুয়ে থাকে। গরু এদিক যায়, ওদিক যায়। ছেলেটার হেলদোল নেই। দিব্যি ঘুমোয়। রঙ ওঠা গোলাপী ফ্রক পরা কালোকোলো সাঁওতাল মেয়ে দৌড়ে গিয়ে ধরে ছাগলছানা। কোলে তুলে নেয়। আমার চোখে চোখ পড়ে। ঝকঝক করে হাসে। ওর চোখে রোদ্দুরের আলো। নাকে রূপোলী নোলকের ঝিলমিল। রুখু চুলে মেয়েটা যেন আমার আয়না।

webdesigner